Human Timelines Myth & History

Hot

Post Top Ad

Saturday, February 17, 2018

ইতিহাসঃ আলেকজান্ডার কুরআন ও বাইবেল অনুসারে।

February 17, 2018 0


দশ বছরের এক কিশোর। অন্যদের মত সাধারণ নয়, ঝাঁকড়া সোনালী চুলের এ কিশোর প্রতাপশালী এক রাজ্যের রাজপুত্র। রাজ্যে একটি ঘোড়া ছিল অদ্ভূত বৈশিষ্টের। এর মাথার আকৃতি ষাঁড়ের মত দেখতে। সুগঠিত পেশীর এই ঘোড়ার গায়ে প্রচন্ড শক্তি, প্রসস্ত দেহ, চওড়া পিঠ। তেজে টগবগ করত সারাক্ষণ। কেউ বাগে আনতে পারেনি একে। তাই রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন ঘোড়াটি বিক্রি করে দেবেন। একথা কানে যেতেই কিশোর রাজপুত্রের মন বিষন্ন হয়ে গেল। কারণ এ ঘোড়টির মধ্যে সে তার নিজের ছায়া দেখতো। কেন জানি কিশোর যুবরাজের ইচ্ছা হতো এর পিঠে সওয়ার হয়ে তীর বেগে ছুটে যাওয়ার। ইচ্ছা হত দিগন্ত ভেদ করে সকালের উদিয়মান সূর্যের লাল টকটকে গোলকের ভেতর মিলিয়ে যেতে। ঘোড়াটা বিক্রির ব্যাপারে সবকিছু যখন চূড়ান্ত, কিশোর রাজপুত্র আর তর সইতে পারলোনা। একলাফে অভিজ্ঞ সওয়ারীর মত চড়ে বসল এর পিঠে। সাথে সাথেই চিহি ডাক তুলে তাকে পিঠে নিয়ে ছুটলো উল্কার মত। অ™ভ‚ত তেজী এ ঘোড়ার পিঠে সেঁটে বসা ছোট্ট এ কিশোরকে মনে হয়েছিল একটি ধনুক। ঘটনা দেখেতো সবাই তাজ্জব। বাবা বুকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেলেন। উৎফুলø হয়ে সেদিন তিনি বলেছিলেন “আমার সন্তান, তুমি এ রাজ্যের বাইরেও সীমান্তকে সম্প্রসারণ কর। কেবল ম্যাকডোন তোমার জন্য যথেস্ট নয়।”
সত্যিই হল সেকথা। এই কিশোরই পরবর্তীতে দিগি¦জয়ী হয়েছিল, শাসন করেছিলো অর্ধেক পৃথিবী। ইতিহাস খ্যাত বীর আলেকজান্ডারই হলো সেই কিশোর এবং ম্যাকডোনের শাসক ফিলিপ-২ ছিলেন তার বাবা। মায়ের নাম অলিম্পিয়া।
ভালবাসার সেই ঘোড়াটি সবসময় তার কাছে প্রিয়-ই ছিলো। এর নাম ছিলো বুচিফালুস। যার অর্থ হল ষাঁড়ের মত মাথা। সকল অভিযানে ভালবাসার বুচিফালূসের পিঠে চড়ে ছুটতেন তিনি। আলেকজান্ডার এটিকে এমন ভালবাসতেন যে, ঘোড়াটি মারা যাবার পর এর নামে একটি শহরের নামকরণ করেছিলেন। যা বুচিফালুস বা বুচিফালা নামে পরিচিত। অনেকে মনে করেন বুচিফালুসের মৃত্যু হয়েছে ভারতের যুদ্ধে। আবার অনেকের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধ হয়ে ঘোড়াটি মারা যায়।
বাবা ফিলিপ এবং মা অলিম্পিয়া
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। যার জন্ম নিয়েই রয়েছে নানা কিংবদন্তী। বাবা ফিলিপ এবং মা অলিম্পিয়া আলেকজান্ডারের জন্মের পূর্বে অদ্ভূত ধরনের স্বপ্ন দেখতেন। ফিলিপ দেখেছিলেন, তিনি অলিম্পিয়ার গর্ভে সিংহের মোহর প্রতিস্থাপন করে দিয়েছেন। এ স্বপ্নটি নিয়ে রাজ্যের গণকদের সাথে কথা বললে তারা ভবিষ্যদ্বানী করেন, শীঘ্রই অলিম্পিয়ার গর্ভে একটি ছেলে সন্তান আসছে। এ সন্তানটি হবে সিংহের মত।
কিংবদন্তীর আলেকজান্ডার ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বে জন্মগ্রহণ করেন ম্যাকডোনের রাজধানী পেলাতে। তিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সফল সেনানায়ক এবং সুকৌশলী যুদ্ধা। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছিলো তাঁর সাহস আর প্রতাপের কথা। বাবা ফিলিপ-২ এর মৃত্যুর পর পারস্য, এনাটোলিয়া, সিরিয়া, ফইনিসিয়া, জুদিয়া, গাজা, মিশর, ব্যক্ট্রিয়া, মেসোপটেমিয়া এবং ভারতের পাঞ্জাব পর্যন্ত তাঁর শাসন বিস্তৃত হয়।
ছোটবেলার শিক্ষক এরিস্টটলের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বুদ্ধিবৃত্তির এতটা প্রসার ঘটেছিল যে, তিনি সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক করতেন। আলেকজান্ডারের বয়স যখন ১৩, তখন থেকে তিনি এরিস্টটলের ছাত্র হয়ে যান। নিয়মিত এরিস্টটলের কাছে তাত্তি¡ক ও ব্যবহারিক শিক্ষা নিতেন। এরিস্টটল তাকে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র, মানুষের আচরণবিধি, পশু পাখি জীব জন্তু ও শস্যসহ অনেক বিষয়ই ছিল তার শিক্ষনিয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। এরিস্টটলের কাছে এসব শিক্ষা পুঁথিবদ্ধ ছিলনা। আলেকজান্ডারের শরীর গঠনের জন্য নিয়মিত শারীরিক অনুশীলন করার অভ্যাসও তৈরি হয় এরিস্টটলের মাধ্যমে।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম দিক থেকেই আলেকজান্ডারের পরিকল্পনা ছিলো আরব উপদ্বীপে তাঁর সৈন্যবাহিণী এবং অর্থনৈতিক ব্যাপকতা প্রসারিত করবেন। পূর্ব-পশ্চিম সকল দিকের শাসক হবেন তিনি। সে কারণে প্রয়োজন একটি চৌকস সেনাবাহিনীর। সে লক্ষে কাজও করেছেন তিনি, বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন ভ‚মি ও আবহাওয়ায় সৈন্যদেরকে খাপ খাওয়ানোর জন্য ব্যাপকহারে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে তিনি তার সেনাবাহিনী গঠন করেন। এসব কৌশল এবং পন্থা অবলম্বন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে কেবল এরিস্টটলের ছাত্র হওয়ার সুবাদে।
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট সম্বন্ধে রয়েছে অনেক আলোচনা, পর্যালোচনা, সুনাম, দুর্নাম। প্রচলিত রয়েছে অনেক কাহিনী। উদার, হিংস্র কিংবা কৌশলী বিভিন্ন আখ্যায় আখ্যায়িত করা হয় তাকে। তার সম্বন্ধে ভাষ্য রয়েছে বাইবেলসহ নানা ধর্মগ্রন্থে, কালজয়ী বিভিন্ন সাহিত্যে। মুসলমান পন্ডিতদের কেউ কেউ মনে করছেন পবিত্র কোরআনে বর্ণিত জুলকারণাইন-ই হলো আলেকজান্ডার। আসলেই কি তাই!


আলেকজান্ডারের রাজত্ব

ম্যাকডোনের সিংহাসনে আলেকজান্ডার
৩৩৯ খ্রিস্টপূর্বে আলেকজান্ডারের বাবা যখন ৫ম স্ত্রী কিউপেট্রা ইউরিডাইসকে বিয়ে করে আনেন তখন থেকে শুরু হয়ে যায় পারিবারিক দ্বন্দ। এর পেছনের কারণ হলো জাতিয়তাবাদী চেতনা। আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়া ছিলেন এপিরাসের অধিবাসিনী। অপরদিকে ৫ম স্ত্রী কিওপেট্টা ছিলেন নিখাঁদ ম্যাকডোনের কণ্যা। এ জাতিয়তাবাদ নিয়েই শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক নানা চক্রান্ত। অলিম্পিয়া এবং কিউপেট্রার মাঝে চলতে থাকে ঠান্ডা লড়াই। কিউপেট্রা এবং তার পক্ষের লোকজন আলেকজান্ডারের উত্থানকে সহ্য করতে পারতনা। এপিরাসের কণ্যার গর্ভের সন্তান কখনো ম্যাকডোনের রাজার উত্তরাধিকারী হতে পারেনা। ম্যাকডোনের সিংহাসনে চাই নিখাঁদ ম্যাকডোনের সন্তান। এ যুক্তির পক্ষে সিংহাসনের উত্থরাধিকারী নিয়ে অলিম্পিয়াকে কোণঠাসা করার চেস্টা চলত। সম্ভবত এসব কারণেই পরবর্তীতে আলেকজান্ডারের ক্ষোভ জন্মেছিল এবং তার শাসনামলে তার বাহিনীতে বিভিন্ন অঞ্চলের সেনা অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল।
৪র্থ এবং ৫ম স্ত্রীর মাঝে ঠান্ডা লড়াই ফিলিপ পর্যন্ত গড়ায়, এ বিষয়টি নিয়ে আলেকজান্ডার ও ফিলিপের মাঝে বাক-বিতন্ডাও হয়। আলেকজান্ডারের একটি বেপরোয়া চিৎকারের জবাবে বাবা তাকে লক্ষ্য করে তলোয়ার ছুঁড়ে মেরেছিলেন। এর জের ধরেই মাকে নিয়ে আলেকজান্ডার ম্যাকডোন ত্যাগ করে এপিরাসে চলে যান। কিন্তু তার বোন থেকে যায় ম্যাকডোনেই। সেই বোনের নামও ছিলো কিওপেট্রা।
এর কিছুদিন পর ফিলিপ এবং আলেকজান্ডারের মাঝে আবার সমঝোতা হয় এবং সে আবার ম্যাকডোনে ফিরে আসে। কিন্তু মা থেকে যান এপিরাসে। ৩৩৮ খ্রিস্টপূর্বে বাবার অধীনে আলেকজান্ডার চীরুলিয়া যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। এতে ফিলিপ তাকে সেনাবাহিনীর একটি অংশের অধিনায়ক করে দেন এবং তার বীরত্বের জন্য উৎসবের আয়োজন করেন।
৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বে ফিলিপ তার মেয়ে ক্লিওপেট্রার বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘাতকদের আক্রমণে মারা যান। কেউ কেউ মনে করেন বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতা নিয়েই তাকে হত্যা করা হয়েছে। হয়তো মেয়ের সাবেক প্রেমিক কিংবা মেয়ের স্বামীর সাবেক প্রেমিকা ছিলো ঘাতক। আবার আরেকটি ধারণা রয়েছে যে, ফিলিপকে হত্যা করার পেছনে আলেকজান্ডার এবং অলিম্পিয়ার হাত রয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায় অনেক অনেক বছর পর ইতিহাসের গতি কারো কারো পছন্দমত বাঁক খায়নি এর কি নিশ্চয়তা? বরং ইতিহাসের অনেক ঘটনা বর্তমান বর্ণনায় উল্টো হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
ফিলিপ-২ এর মৃত্যুর পর সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সুকৌশলী সেনানায়ক আলেকজান্ডার মাত্র ২০ বছর বয়সে আরোহণ করেন ম্যাকডোনের সিংহাসনে। সেনাবাহিনী মেনে নেয় তার আনুগত্য।



আলেকজান্ডার এবং রুক্সানা


আলেকজান্ডার এবং তার সেনাপতি হেফিশন এক জাকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দারিউসের দুই কন্যাকে বিয়ে করেন


                                                                                                    সেনাপতি হেফিশন

ব্যক্তিগত জীবন
আলেকজান্ডারের জীবনের দীর্ঘ সময়ের সাথী ছিলেন তার সেনাপতি হেফিশন। তাছারা হেফিশন ছিল তার একজন বড় বন্ধু। তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হেফিশন-ই ছিল বাহিনীর ২য় ব্যক্তি।
আলেকজান্ডার বিয়ে করেন ২টি। প্রথম স্ত্রী ব্যক্ট্রিয়ার আদর্শ কণ্যা রুক্সানা। অপরজন পারস্যের রাজা দারিউস-৩ এবং তার স্ত্রী স্ট্যটেইরা-১ এর কণ্যা স্ট্যটেইরা-২। রুক্সানার জন্ম ৩৪১ খ্রিস্টপূর্বে। ব্যক্ট্রিয়ায় রুক্সানার জন্ম স্থান সম্বন্ধে অনেকের ধারণা তা বর্তমান আফগানিস্তান। আলেকজান্ডারের সাথে রুক্সানার বিয়ে হয় ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বে। অপর স্ত্রী স্ট্যটেইরার সাথে বিয়ে হয় ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বে। পারস্যের রাজা দারিউস-৩ আলেকজান্ডারের সাথে যুদ্ধে হেরে গিয়ে স্ত্রী, দুই কন্যা এবং মাকে রেখে পালিয়ে যান। এর কিছুদিন পর আলেকজান্ডার এবং তার সেনাপতি হেফিশন এক জাকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দারিউসের দুই কন্যাকে বিয়ে করেন। আলেকজান্ডারের সাথে বিয়ে হয় স্ট্যটেইরা-২ এর এবং তার বোন ড্রিপটেইসকে বিয়ে করে হেফিশন।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর পরিবারে রাজ্যের হাল ধরার মত কেউ ছিলেননা। তার ভাই ফিলিপ এরিডাস তখন ছিল মানসিকভাবে অসুস্থ। অপরদিকে ছেলে আলেকজান্ডার-৪ এর জন্মই হয় তার মৃত্যুর পর। তাই বিশাল এ সাম্রাজ্যকে এক করে রাখা সম্ভব হয়নি। সেনাপতিদের মাঝে ভাগ হয়ে চারটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

মৃত্যু ও কফিন
আলেকজান্ডারের মৃত্যু নিয়ে কয়েকটি ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, তাকে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়েছে। কারো মতে পূর্বের ম্যালেরিয়া রোগ আবার তাকে আক্রমণ করেছিল। আবার কেউ মনে করছেন কেবল মাত্র অতিরিক্ত মদ্যপান-ই তার মৃত্যুর কারন। ৩২৩ খ্রীস্টপূর্বের ২৯মে আলেকজান্ডার তার বন্ধুদের সাথে একটি অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত মদ্যপান করেন। তখন থেকেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান। বিছানায় পতিত তরুণ শাসক তখন কথাও বলতে পারেননি। নির্দেশনা দিতে পারেননি জেনারেল ও সৈন্যদেরকে। এমনকি হাত উঁচু করাও তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। এভাবে কয়েকদিন মাত্র। ৩২৩ খ্রীস্টপূর্বের ১০ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন ব্যবিলনের নেবুচাড্্েরজার-২ এর প্রাসাদে। তার জীবনকাল ছিল ৩৩ বছরের চেয়ে ১ মাস কম।
বর্তমানে আলেকজান্ডারের কফিন সংরক্ষিত রয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুল জাদুঘরে। এটি ১৮৮৭ সালে লেবাননের সিডন এর কাছাকাছি কোন একটি স্থান থেকে পাওয়া যায়। আলেকজান্ডারের দেহের ধারক মানুষের আকৃতির এ কফিনটি স্বর্ণের তৈরি। এটি বর্তমানে একটি প্রতীকি ঢিলা কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে। কফিনের পাশেই রয়েছে তার ব্যবহৃত অস্ত্রসস্ত্র।
আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সম্পদ ও ক্ষমতার লোভে অভিযান চালাতেন। ÿমতার দম্ভ ও সম্পদের জন্য তিনি ছিলেন বেপরোয়া। কিন্তু এ কথাও প্রচলিত রয়েছে যে, সহযোগিদের প্রতি আলেকজান্ডারের শেষ অনুরোধ ছিল মৃত্যুর পর তার হাত দুটো যেন কফিনের বাইরে প্রসারিত করে রাখার হয়। যেন সবাই দেখতে পায় বিশ্ববিজয়ী বীর আলেকজান্ডার পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে শূন্য হাতে। বিশাল সাম্রাজ্যের কিছুই তিনি সাথে করে নিয়ে যেতে পারেননি।

বাইবেল এবং আলেকজান্ডার
বাইবেলে আলেকজান্ডারের প্রতীকি বর্ননা রয়েছে। এখানে আলেককজান্ডারের প্রতীক হিসেবে দুইটি শিং এর উলেøখ রয়েছে।
দানিয়েল ৮ঃ৫-৮ পদে রয়েছে “ ... পশ্চিমদিক হইতে এক ছাগ সম¯Í পৃথিবী পার হইয়া আসিল, ভ‚মি স্পর্শ করিল না, আর সেই ছাগের দুই চুর মধ্যস্থানে বিলÿণ একটা শৃঙ্গ ছিল। পরে দুই শৃঙ্গবিশিষ্ট যে মেষকে আমি দেখিয়াছিলাম, নদীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে, তাহার কাছে আসিয়া সে আপন বলের ব্যগ্রতায় তাহার দিকে দৌড়িয়া গলে। আর আমি দেখিলাম, সে মেষের কাছে আসিল, এবং তাহার উপরে ক্রোধ উত্তেজিত হইল, মেষকে আঘাত করিল, ও তাহার দুই শৃঙ্গ ভাঙ্গিয়া ফেলিল, তাহার সম্মুখে দাঁড়াইবার শক্তি ঐ মেষের আর রহিল না, আর সে তাহাকে ভ‚মিতে ফেলিয়া পদতলে দলিতে লাগিল, তাহার হ¯Í হইতে ঐ মেষটীকে উদ্ধার করে, এমন কেহ ছিল না। পরে ঐ ছাগ অতিশয় আত্মগরিমা করিল, কিন্তু বলবান হইলে পর সেই বৃহৎ শৃঙ্গ ভগ্ন হইল, এবং তাহার স্থানে আকাশের চারি বায়ুর দিকে চারিটী বিলÿণ শৃঙ্গ উৎপন্ন হইল। ..”
পরবর্তীতে ২১-২২ পদে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে “ ... তুমি দুই শৃঙ্গবিশিষ্ট যে মেষ দেখিলে, সে মাদীয় ও পারসীক রাজা। আর সেই লোমশ ছাগ যবন দেশের রাজা, এবং তাহার দুই চুর মধ্যস্থানে যে বৃহৎ শৃঙ্গ সে প্রথম রাজা। আর তাহার ভগ্ন হওয়া, ও তৎপরিবর্ত্তে আর চারি শৃঙ্গ উৎপন্ন হওয়া, ইহার মর্ম্ম এই, সেই জাতি হইতে চারি রাজ্য উৎপন্ন হইবে, কিন্তু উহার ন্যায় পরাক্রম-বিশিষ্ট হইবে না। ...”
পশ্চিম দিক থেকে আগত এই ছাগ বা ছাগলটি ছিল গ্রীক সাম্রাজ্যের প্রতীক এবং বড় বড় শিংগুলো ছিল আলেকজান্ডারের প্রতীক, যিনি তার ÿমতার সর্বোচ্চ শিখরে থাকার সময় অকালে মারা যান। পরবর্তীকালে এ সাম্রাজ্য তার চারজন সেনাপতির মাঝে ভাগ হয়ে যায়।

কাসপিয়ান গেট
পবিত্র কোরআন এবং আলেকজান্ডার
পবিত্র কোরআনে ‘আলেকজান্ডার’ নামে সরাসরি কোন ভাষ্য নেই। তবে কোন কোন মুসলিম পন্ডিতগণ মনে করেন সূরা কাহাফ্-এ বর্ণিত জুলকারণাইনই হলেন আলেকজান্ডার। আরব উপদ্বীপে জুলকারণাইন নামটি পরিচিত ছিল অল্প বয়সে অধিক ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে। জুলকারণাইন শব্দটির অর্থ হল দুই শিং বিশিস্ট। এ নামকরনের কারণ সম্পর্কে বহু কথা রয়েছে। কেউ বলেন: তাঁর মাথার চুলে দু’টি গুচ্ছ ছিল, যেগুলো দেখতে শিংএর মত। বেউ বলেন: পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশগুলো জয় করার কারণে জুলকারণাইন খেতাবে ভ‚ষিত হয়েছিলেন তিনি। কেউ এমনও বলেছেন যে, তাঁর মাথায় শিং এর মত দু’টি চিনহ ছিল। অনেকের ধারণা এগুলো ছিল ক্ষত চিনহ। কিন্তু কয়েকজন মুফাচ্ছির বলেছেন এটা নিশ্চিত যে, কোরআন স্বয়ং তাঁর নাম জুলকারণাইন রাখেনি; বরং ইহুদীরা এ নাম দিয়েছিল। ইসলামী পন্ডিতদের অনেকেই কোরআনে বর্ণিত জুলকারণাইনের বৈশিষ্টগুলোর সাথে আলেকজান্ডারের বৈশিষ্টের মিল খুঁজে পান। এর মাঝে উলেøখযোগ্য হলো আলেকজান্ডারও ‘দুই শিং বিশিস্ট’ হিসেবে খ্যাত এবং তিনি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের দেশগুলো জয় করেছিলেন। তাছারা বাইবেলেও আলেকজান্ডারকে দুই শিংবিশিস্ট বলেই অভিহিত করা হয়েছে।
আলøাহতাআয়ালা বিভিন্ন সময় পৃথিবীর মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। এদের মাঝে মাত্র কয়েকজনের নাম কোরআনে উলেøখ রয়েছে। নবী হিসেবে জুলকারণাইন এর নাম উলেøখ নেই, আবার তিনি নবী ছিলেননা এমনটিও বলা হয়নি। তাই পন্ডিতদের কেউ কেউ বলছেন হয়তো জুলকারণাইন আলøাহ প্রেরিত নবীদের মাঝে একজন ছিলেন। হয়তো সে কারনেই নিপীড়িত মানুষ সাহায্য, সহযোগিতার জন্য তাঁর কাছে ছুটে আসত। অনুসরণ করতো তাঁর দিক নির্দেশনা। তিনি নবী ছিলেন কি ছিলেননা, সে বিতর্কে না গিয়ে জুলকারণাইন-ই হলেন আলেকজান্ডার পন্ডিতদের একাংশের এ ধারণা কিভাবে হলো, তা স্পস্ট হবে কোরআনের এ বর্ণনা থেকে
“ ওরা তোমাকে জুলকারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে। বলো, ‘আমি তোমাদের কাছে তার কথা বয়ান করব।’ আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম ও প্রত্যেক বিষয়ের উপায় ও পথনির্দেশ করেছিলাম। সে এক পথ অবলম্বন করল। চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অ¯Íাচলে পৌঁছাল তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলে অ¯Í যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক স¤প্রদায়কে দেখতে পেল। আমি বললাম, ‘হে জুলকারণাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার বা এদের সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।’
সে বলল, ‘যে-কেউ সীমালঙ্ঘন করবে আমি তাকে শা¯িÍ দেব, তারপর তাকে প্রতিপালকের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে ও তিনি তাকে কঠিন শা¯িÍ দেবেন। তবে যে বিশ্বাস করে সৎকর্ম করে তার জন্য প্রতিদান হিসেবে আছে কল্যাণ ও তার সাথে ব্যবহার করার সময় আমি সহজভাবে কথা বলব।’
আবার সে এক পথ ধরল। চলতে চলতে যখন অরুণাচলে পৌঁছল তখন সে দেখল তা (সূর্য) এমন এক স¤প্রদায়ের ওপর উঠছে যাদের জন্য সূর্যের তাপ থেকে আত্মরÿার জন্য আমি কোনো আড়াল সৃষ্টি করি নি। প্রকৃত ঘটনা এই, তার বিবরণ আমি ভালো ক’রে জানি।
আবার সে এক পথ ধরল। চলতে চলতে সে যখন পাহাড়ের প্রাচীরের মাঝখানে পৌঁছল তখন সেখানে সে এক স¤প্রদায়কে পেল যারা তার কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। ওরা বলল, ‘হে জুলকারণাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে; আমরা কি তোমাকে কর এই শর্তে দেব যে তুমি আমাদের ও ওদের মধ্যে এক প্রাচীর গ’ড়ে দেবে?
সে বলল, ‘আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন তা-ই ভালো। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও ওদের মাঝখানে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দেব। তোমরা আমার কাছে লোহার তাল নিয়ে আসো।’ তারপর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূর্ণ হয়ে যখন লোহার ঢিপি দুটো পাহাড়ের সমান হল তখন বলল, ‘তোমরা হাপরে দম দিতে থাকো।’ যখন তা আগুনের মতো গরম হল তখন সে বলল, ‘তোমরা গলানো তামা নিয়ে আসো, আমি তা ওর ওপর ঢেলে দেব।’
এরপর ইয়াজুজ ও মাজুজ তা পার হতে পারল না বা ভেদ করতেও পারল না। সে (জুলকারণাইন বলল, ‘এ আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রæতি পূর্ণ হবে তখন তিনি ওকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবেন, আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।’
সেদিন আমি ওদেরকে দলেদলে তরঙ্গের আকারে ছেড়ে দেব, আর শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। তারপর আমি ওদের সকলকেই একত্র করব। আর সেদিন আমি জাহান্নামকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত করব অবিশ্বাসীদের কাছে, যাদের চু আমার নিদর্শনের প্রতি ছিল অন্ধ, আর যাদের শোনারও ক্ষমতা ছিল না।” (সূরা কাহাফ্ ৮৩-১০১)
জুলকারণাইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়াতেন নির্যাতীত, বঞ্চিত, শাসকের হাতে শোসিত লোকদের মুক্তি দিতেন। আলেকজান্ডারের বেলায়ও ঘুরে বেড়ানোর এবং রাজ্য জয় করার ইতিহাস রয়েছে। কুরআনের বর্ননা অনুযায়ী অরুণাচলে, যেখান থেকে সূর্য উদিত হয় সেখানে ইয়াজুজ, মাজুজের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন জুলকারণাইন। আর সে স্থানটি পাহাড়ের প্রাচীরের মাঝখানে। এই বর্ণনার সাথে মিলে যায় এমন একটি দেয়াল রয়েছে কাসপিয়ান সাগর উপক‚লে। ইতিহাসবিদদের দ্বারা স্বীকৃত যে এ দেয়াল তৈরি করেছিলেন আলেকজান্ডার। যা তৈরি করতে লোহা ও তামা ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে একটি তোরণ রয়েছে যেটি ‘কাসপিয়ান গেট’ বা আলেকজান্ডারের গেট নামে পরিচিত। দারিয়াল এবং ডারবেন্ট নামে দুটি শহরে এর ব্যপ্তি। দারিয়াল রাশিয়া এবং জর্জিয়ার সীমান্তে অবস্থিত। এটিকে বলা হয় কাজবেক পাহাড়ের পূর্ব প্রাম্ভ। ডারবেন্ট রাশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত একটি শহর। কাসপিয়ান সাগরের দক্ষিণপূর্ব উপকূলে নির্মীত এ দেয়ালটি তোলা হয়েছে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা যায়গ্রায়। এ পাহাড় দুটিকে বলা হয় পৃথিবীর ¯Íন। আলেকজান্ডার নির্মীত এ দেয়ালের উচ্চতা ২০ মিটার এবং এটি ৩ মিটার (১০ ফুট) পুরো। এ দেয়াল ভেদ করে শত্রæদের এগিয়ে আসা অসম্ভব। তাছারা কাসপিয়ান গেটে আলেকজান্ডার রেখেছিলেন নিñিদ্র পাহাড়া। যেন গ্রীকের শত্রæরা দেয়ালের এ পাশে কোনভাবেই আসতে না পারে। কুরআনে রয়েছে যে, ইয়াজুজ মাজুজের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য এ দেয়াল নির্মাণ করা হয়। ইয়াজুজ মাজুজ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন এ নামে অত্যাচারী শাসক ছিলো। আবার কারো মতে প্রতিকী অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এ দুটি শব্দ। এ প্রতীক হতে পারে অত্যাচারী শাসক বা শাসকদের, যারা কাসপিয়ান সাগরের এ উপক‚র দিয়ে আক্রমণ ও লুণ্ঠন চালাত।
মুসলমান পন্ডিতদের পাশাপাশি পশ্চিমা অনেক পন্ডিতগণও আলেকজান্ডারকে জুলকারণাইন বলেই অভিহীত করেন। কারণ কুরআন এবং বাইবেলে বর্ণিত অনেককিছুর সাথেই সাদৃশ্য রয়েছে বর্তমানে প্রচলিত আলেকজান্ডারের ইতিহাসের। প্রশ্ন উঠতে পারে কুরআনে বর্ণিত জুলকারণাইন ছিলেন সু শাসক। কিন্তু সেই জুলকারণাইনকে কিভাবে আলেকজান্ডার ধরা হবে? কারণ আলেকজান্ডারের ব্যাপারে সুনামের চেয়ে দুর্নামের কথা-ই বেশি প্রচলিত রয়েছে। তাছারা আলেকজান্ডারের আস্তিকতার ব্যাপারে স্বীকৃতি থাকলেও অনেকে মনে করছেন তিনি ছিলেন অগ্নিপূজক। এর সঠিক জবাব হলো পবিত্র কোরআন ব্যতিত আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মগ্রন্থগুলো যদি সময়ের সাথে সাথে মানুষের খেয়াল খুশিমত পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে, তো একজন ব্যক্তি বা শাসকের চরিত্রও বিকৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক নয় তাদের দর্শন বিবর্তনের।
হাজার হাজার বছর পর বিতর্ক করে হয়তো দেখা যাবে আলেকজান্ডার আদৌ জুলকারণাইন ছিলেননা। আবার হয়তো আরো গভীর পর্যালোচনা করলে একথাটি দাঁড়িয়ে যাবে আলেকজান্ডার দ্যা গ্র্যাট ছিলেন জুলকারণাইন।


Read More

ইতিহাসঃ জুলকারনাইন নাকি নবী সুলাইমান ছিলেন অ্যালেক্সান্ডার

February 17, 2018 0



কুরআন প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। “আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলমানদের) জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ, দয়া, ও সুসংবাদস্বরূপ আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (সূরা নাহল, ১৬ঃ৮৯)।সুবহানআল্লাহ।


জুলকারনাইন অর্থ দুই যুগের বিশ্বাসী পরাশক্তি। আগের যুগে জুলকারনাইন ছিলেন নবী সুলাইমান আলাইহিস সালাম।

প্রথমত, জুলকারনাইনকে অবশ্যই ইহুদিদের পরিচিত ও নিকটবর্তী কোন রাজা হতে হবে। এজন্যই ইহুদিরা তাঁর সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত ছিল এবং রাসুল (সা) কে এ ব্যপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর নব্যুয়াতের পরীক্ষা নিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, পবিত্র কোরানে জুলকারনাইনের বর্ণনা এমনভাবে এসেছে যেন জুলকারনাইন আল্লাহতালার সাথে কথাবার্তা আদানপ্রদান করতেন।

অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন। [ সুরা কা’হফ: ৮৬ ]
তিনি বললেনঃ যে কেউ সীমালঙ্ঘনকারী হবে আমি তাকে শাস্তি দেব। অতঃপর তিনি তাঁর পালনকর্তার কাছে ফিরে যাবেন। তিনি তাকে কঠোর শাস্তি দেবেন। [সুরা কা’হফ: ৮৭ ]

অর্থাৎ জুলকারনাইনের উপর ওহী নাযিল হত এবং তিনি আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারতেন। এটা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, জুলকারনাইন নবী-রাসুলদের একজন ছিলেন। অর্থাৎ তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ রাজাও ছিলেন এবং একজন নবীও ছিলেন। তাই কাইরাস, আলেক্সান্ডার এসব নামকে আমরা গারবেজ বিনে ফেলে দিতেই পারি যেহেতু তওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কোরান– কোন আসমানি কিতাবেই তাদেরকে নবী বলা হয়নি। এখন বলুন, ইহুদিদের পরিচিত ও নিকটবর্তী নবী+ন্যায়পরায়ন রাজা কে? অবশ্যই সুলাইমান (আ)।

তৃতীয়ত, যেহেতু জুলকারনাইন নবী ছিলেন, তাই তাঁর কাঁধে তাঁর কওমকে সত্যের পথে আহবানের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এই মহান ও বিশাল দায়িত্ব থাকায় তিনি বছরের পর বছর সফর করে বেড়াবেন, এটা হতে পারে না। কিন্তু তখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে প্রচুর সময় লাগত যেহেতু দ্রুততর যানবাহন ছিল না। তাই জুলকারনাইনকে অবশ্যই এমন কোন ক্ষমতার অধিকারী হতে হত, যার দ্বারা তিনি সহজেই খুব কম সময়ে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকের স্থানগুলোতে ভ্রমণ করতে পারতেন আর একই সাথে নিজ কওমের প্রতি তাঁর কর্তব্যসমূহও পালন করতে পারতেন। সুলাইমান (আ) এর সেই ক্ষমতা ছিল।

তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হত যেখানে সে পৌছাতে চাইত। [ সুরা সা’দ: ৩৬ ]

চতুর্থত, জুলকারনাইন ইয়াজুজ মাজুজদের আটকাতে পাহাড়ের উচ্চতা সমান দেয়াল নির্মাণ করেন। এতে তিনি লোহার সাথে গলিত তামা ব্যবহার করেন।

তোমরা আমাকে লোহার পাত দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা গলিত তামা নিয়ে এস, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই। [সুরা কা’হফ: ৯৬]

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, লোহা সেখানে মজুদ ছিল। তাই জুলকারনাইন বলেছিলেন, গিভ মি। কিন্তু গলিত তামা সেখানে মজুদ ছিল না। তাই তিনি বলেছিলেন, ব্রিং মি (নিয়ে এসো)। জুলকারনাইন কোথা থেকে নিয়ে আসতে বলছিলেন এই বিপুল পরিমাণ তামা???

আর আমি সোলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আমি তার জন্যে গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম…. [সুরা সা’বা: ১২]

অর্থাৎ সুলাইমান (আ) এর গলিত তামার ঝরণা ছিল!!!
কিন্তু ইজরায়েল থেকে ককেশাস পর্যন্ত এত তামা আনা কীভাবে সম্ভব??? তখন তো এরোপ্লেন ছিল না।
َ
সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? [সুরা নাম’ল: ৩৮ ]
জনৈক দৈত্য-জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত। [সুরা নাম’ল: ৩৯ ]
কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল। [সুরা নাম’ল: ৪০ ]

এখন প্রশ্ন হলো, এত উঁচু দেয়াল যা শক্তিশালী ইয়াজুজ মাজুজ টপকাতে পারেনি, তা কীভাবে জুলকারনাইন বানালেন আধুনিক কোন প্রযুক্তি ছাড়াই?

আর সকল শয়তানকে তার অধীন করে দিলাম, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী। [সুরা সা’দ: ৩৭]

জুলকারনাইন পাহাড়ের নিকটবর্তী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কোন খাজনা নেন নি। কারণ তিনি আল্লাহর দেয়া নিয়ামতেই সন্তুষ্ট ছিলেন।

তিনি বললেনঃ আমার পালনকর্তা আমাকে যা দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট…. [সুরা কাহফ: ৯৫]

আর সুলাইমান (আ) ও একইরকম ছিলেন।

অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদের প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক। [সুরা নাম’ল: ৩৬]

বুঝতে পারছেন কী, দুজন একই ব্যক্তি???

জুলকারনাইন আল্লাহতা’লার কাছ থেকে বে-হিসেব অনুগ্রহ পেয়েছিলেন। জুলকারনাইন যখন পশ্চিমাভিযানে যান, সেখানে আল্লাহতা’লা তাকে কী বলেন?

অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে জুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন। [ সুরা কা’হফ: ৮৬]

হযরত সুলাইমান (আ)-ও আল্লাহতালার কাছ থেকে বে-হিসেব অনুগ্রহ লাভ করেন।

এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব, এগুলো কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও-এর কোন হিসেব দিতে হবে না।
[সুরা সা’দ: ৩৯]

যাবুর কিতাবে উল্লেখ রয়েছেঃ

Psalms 72
David to His son Solomon,
1 Give the king thy judgments, O God, and
thy righteousness unto the king’s son.
2 He shall judge thy people with righteousness, and thy poor with judgment.
3 The mountains shall bring peace to the people, and the little hills, by righteousness.
4 He shall judge the poor of the people, he shall save the children of the needy, and shall break in pieces the oppressor.
5 They shall fear thee as long as the sun and moon endure, throughout all generations.
6 He shall come down like rain upon the mown grass: as showers that water the earth.
7 In his days shall the righteous flourish; and abundance of peace so long as the moon endureth.
8 He shall have dominion also from sea to sea, and from the river unto the ends of the earth.
9 They that dwell in the wilderness shall bow before him; and his enemies shall lick the dust.

যুলকারনাইনের প্রচলিত মতবাদ
Kaisar Ahmed নতুন থট। আমি জানতাম সাইরাস দ্য গ্রেট যুলকারনাইন হতে পারে ইতিহাসে সাইরাস ইমান এনেছিল এমন শুনা যায়। দানিয়াল আ ও উযায়ের আ এর পরামর্শে রাজ্য পরিচালনা করতেন আর তাদের পরামর্শেই জেরুজালেমে ইয়াহুদিদের কে ফিরিয়ে আনেন। ইতিহাসেও পাওয়া যায় তিনি ব্ল্যাক সি ও ক্যাস্পিয়ান সি’র দিকে অভিযান করেছিলেন এবং দারিয়াল জর্জ প্রাচীর নির্মাণ করেন।

Ashraf Mahmud সাইরাস দ্য গ্রেট যে জুলকারনাইন নন, তা’ আমি পড়েছি। তবে, জুলকারনাইন কে, তা’ কেউই সনাক্ত ও চিহ্নিত করতে পারেনি। তিনি রহস্যময় ও অজ্ঞাত হিসেবে রয়েই গেছেন।

TF Evan জুলকারনাইন সম্পর্কে যতটা জানার দরকার ততটাই আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন । এর বেশি জেনে আমাদের আর কোন লাভ নেই তাই তিনি রহস্যময় ও অজ্ঞাত ।

শীতল নদীর কোলে আল কোরআনে যে যুলকারনাইনের কথা বলা হচ্ছে তিনি কে ছিলেন, এ বিষয়ে প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত মতবিরোধ চলে আসছে। প্রাচীন যুগের মুফাস্সিরগণ সাধারণত যুলকারনাইন বলতে আলেকজাণ্ডারকেই বুঝিয়েছেন। কিন্তু কুরআনে তাঁর যে গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে, আলেকজাণ্ডারের সাথে তার মিল খুবই কম। আধুনিক যুগে ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর ভিত্তিতে মুফাসসিরগণের অধিকাংশ এ মত পোষণ করেন যে, তিনি ছিলেন ইরানের শাসনকর্তা খুরস তথা খসরু বা সাইরাস। এ মত তুলনামূলকভাবে বেশী যুক্তিগ্রাহ্য। তবুও এখনো পর্যন্ত সঠিক ও নিশ্চিতভাবে কোন ব্যক্তিকে যুলকারনাইন হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারেনি।

Aktar Khan কুরআন শরীফের সূরা কাহাফের আয়াত নম্বর ৮৩-১০১ অংশে জুলকারনাইন সম্পর্কিত বর্ণনা আছে। নবী হিসেবে জুলকারনাইনের নাম উল্লেখ নেই যদিও কিন্তু তিনি নবী ছিলেন না এমনটিও বলা হয়নি।
Read More

ইতিহাসঃ সাতচল্লিশে সিলেট কীভাবে পাকিস্তানের অংশ হল?

February 17, 2018 0
 


১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হলেও প্রশ্ন ওঠে আসামের অংশ সিলেটের ভাগ্যে কী হবে।

মুসলমান আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার যে দায়িত্ব পড়েছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর।

১৯৪৭র ৩রা জুন এক ঘোষণায় তিনি সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারনের দায়িত্ব দেন স্থানীয় জনসাধারণের কাঁধে। সিদ্ধান্ত হলো গণভোট অনুষ্ঠানের।

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ই জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন। ভোট দিয়েছিল ৭৭ শতাংশ মানুষ।

২৩৯ টি ভোটকেন্দ্রে বড় কোনো ঝামেলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছিল বলেই জানা যায়। ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী সিলেটে গণভোট সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা দেয়া হয়েছে।ছবির কপিরাইট বিবিসিImage caption সিলেটের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়

দেশভাগের সময় ৫ম শ্রেণীর ছাত্র জকিগঞ্জের মোহাম্মদ নুরউদ্দীনের মনে রয়েছে সেই ভোটের কথা। মোহাম্মদ নূরউদ্দীন তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন করিমগঞ্জের প্রাথমিক স্কুলে।

ভোটে করিমগঞ্জের মানুষও আসাম ছাড়ার রায় দিলেও করিমগঞ্জের কিছু অংশ র‍্যাডক্লিফ লাইনে ভারতের আসামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

“আমরা বাইরাইয়া মিছিল দিছি করিমগঞ্জে। মসজিদ যেখানে ছিল সেখানে স্লোগান নাই। এইভাবে করছি। ভোটে আমরা করিমগঞ্জকেও পাইছি। এই যে সাড়ে তিন থানা গেল সবটা পাইছি। কিন্তু আমাদের নেতাদের অভাবেই কংগ্রেস বড়লাটের লগে মিল করিয়া নিয়া গেছে।”

কুশিয়ারা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নূরউদ্দীন বলেন, তার নানা বাড়ী, ভগ্নীপতিসহ অনেক আত্মীয়ের বাড়ী পড়ে যায় করিমগঞ্জে আর তারা থাকেন পূর্ব বাংলায় বর্তমান জকিগঞ্জ এলাকায়।

“আত্মীয়স্বজন সবাই থাইকা গেছে। ইন্ডিয়ায় থাকছে। এখনো আছে। আমরার যাওয়া আসা নাই। তারাও আসে না।”

সিলেটের গণভোট দেখেছেন মাহতাবউদ্দীন আহমেদও। মনে করে বলেন সেই কিশোর বয়সে বড়দের সঙ্গে পাকিস্তানের পক্ষে কী স্লোগান দিতেন তারা।

“মুসলীম লীগের মার্কা কী- কুড়াল ছাড়া কী, পাকিস্তান জিন্দাবাদ-লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, কায়দে আজম জিন্দাবাদ এইগুলা স্লোগান ছিল।”

মাহতাবউদ্দীন জানান ভোটের প্রচারে সিলেটে মুসলিম লীগের বড় নেতারা এসেছেন। তার মনে আছে সিলেটের শাহী ইদগায়ে মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহও এসেছিলেন।

দাবি করলেন গণভোটের প্রচারে এসে করিমগঞ্জে তাদের বাড়ীতে একবেলা খেয়েছিলেন তৎকালীন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১২জন কর্মী।

“কংগ্রেসের মার্কা ছিল ঘর আর মুসলীম লীগের ছিল কুড়াল। হিন্দুদের মধ্যে নমোশূদ্ররা ছিল মুসলীম লীগের পক্ষে। আলেমদের একদল ছিল কংগ্রেসি। হুসেইন আহমেদ মাদানী উনি আর ওনার একটা গ্রুপ ছিল কংগ্রেসি।”ছবির কপিরাইট বিবিসিImage caption র‍্যাডক্লিফ লাইন কিন্তু সিলেটের মানুষের কাছে বিতর্কিতই রয়ে গেছে

দেশভাগের ইতিহাসে সিলেটের গণভোট এক বিরল ঘটনা। এই ভোটে জয়ী হতে মুসলীম লীগের ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালায়। সিলেটের জনগণকে পাকিস্তানের পক্ষে ভোটদিতে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল মুসলীম লীগ।

পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়া ফরজ ঘোষণা করে ফতোয়াও জারি করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ে উল্লেখ রয়েছে গণভোটের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচশো কর্মী নিয়ে কলকাতা থেকে সিলেট এসেছিলেন।

শেখ মুজিব লিখেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুরোধে হিন্দু রায়বাহাদুর আরপি সাহা একাধিক লঞ্চ সিলেটে পাঠিয়েছিলেন মুসলীম লীগের পক্ষে। লিখেছেন সিলেটে গণভোটে জয়লাভ করে তারা আবার কলকাতা ফিরে যান।

শিক্ষাবিদ ও সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলীম সাহিত্য সংসদের সভাপতি অধ্যাপক মো. আব্দুল আজিজ তখন ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র।

তিনি বলেন, “মুসলমানদের জন্য গণভোট পরিচালনার জন্য একটা রেফারেন্ডাম বোর্ড হয়। সেই বোর্ডের সভাপতি হলেন আব্দুল মতিন চৌধুরী নামে একজন প্রবীণ নেতা। যিনি এককালে জিন্নাহ সাহেবের খুব ঘনিষ্টজন ছিলেন। আর সেক্রেটারি হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল হাফিজ যিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের বাবা।”ছবির কপিরাইট বিবিসিImage caption সিলেটের শিক্ষাবিদ মো. আব্দুল আজিজ

তার কথায় সিলেটে ৬০ ভাগ মুসলিম থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের একটি অংশ কংগ্রেসপন্থী হওয়ায় ভোটের প্রচার প্রচারণার প্রয়োজন হয়।

“পাকিস্তানের পক্ষে পড়লো ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট আর ভারতে যোগদানের পক্ষে পড়লো ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। মুসলীম লীগ ৫৫ হাজার ৫শ ৭৮ ভোট বেশি। এজন্য সিলেটিরা গর্ব অনুভব করতো যে আমরা বাই চয়েস পাকিস্তানে আসছি।”

১৯৪৭-এ সিলেটের ঐতিহাসিক গণভোটেই ঠিক হয় পূর্ব পাকিস্তানের একাংশের মানচিত্র।

কিন্তু গণভোটের রায় না মেনে মানচিত্রে দাগ কেটে করিমগঞ্জের কিছু অংশ ভারতকে দিয়ে দেয়ায় সিলেটের মানুষের কাছেও চির বিতর্কিত হয়ে যায় র‍্যাডক্লিফ লাইন।
Read More

ইতিহাসঃ ফেরাউনের পরিচয়

February 17, 2018 0




মিশরে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল খ্রীস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে।নীল নদকে কেন্দ্র করে মিশরের এ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস মিশরকে বলেছেন “নীল নদের দান”(Gift of the Nile)।৫০০০-৩২০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়ের মিশরকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়।এ সময় মিশর কতগুলো ছোট ছোট নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এগুলোকে বলা হয় নোম।৩২০০ খ্রীষ্টপুর্বাব্দে “মেনেস” নামের এক রাজা সমগ্র মিশরকে একত্রিত করে একটি নগর রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। দক্ষিণ মিশরের “মেস্ফিস” হয় এর রাজধানী। এভাবে মিশরে রাজবংশের সূচনা হয়।



ফেরাউন মূলত কারো নাম নয়।ফারাও হলো গ্রিক-রোমান কর্তৃক বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রাচীন মিশরীয় রাজবংশের রাজাদের প্রচলিত উপাধি। বনি ইসরাইলিদের যুগের ধর্ম যাজক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের উপাধি। পরবর্তীতে বনি ইসরাইলিরা যখন রাজ্য শাসনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন যারা ঐ অঞ্চলের রাজা হতো তাদেরকে ফেরাউন বলে সম্বোধন করা হতো।

আমালেকা জাতির রাজার খেতাব ছিল ফেরাউন।মিশরের অধিবাসী কিবতীদের রাজার খেতাবও ছিল ফেরাউন। হজরত মুসা আলাইহিস সালামের সময়ের (কিবতীদের শাসক) ফিরাউনের নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে-

হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি রামেসিস ও পিথম নগরী নির্মাণ করেন। সে-ই হচ্ছেন দ্বিতীয় রামেসিস।

কেউ কেউ বলেন হজরত মুসা আলাইহিস সালাম মাদিয়ানে অবস্থানকালে ক্ষমতাসীন ফেরাউনের (অর্থাৎ দ্বিতীয় রামেসিসের) মৃত্যু ঘটে এবং হযরত মুসার জীবনের পরবর্তী ঘটনাবলী সংঘটিত হয় দ্বিতীয় রামেসিসের উত্তরাধিকারী মারনেপতাহর রাজত্বকালে।

কেউ কেউ বলেন, হজরত মুসা আলাইহিস সালামের যুগের ফেরাউনের নাম ছিল ওলীদ ইবনে মাসআব ইবনে রাইয়ান। তার বয়স হয়েছিল চারশত বছরেরও অধিক। হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের যুগের ফেরাউনের নাম ছিল রাইয়ান। এ দুই ফেরাউনের মধ্যে ৪০০ বছর সময়ের ব্যবধান ছিল।

প্রাচীন মিশরের নতুন রাজ্যের সময় ফেরাউনরা ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা ছিল। “বড় বাড়ি” বলতে তখন রাজাদের বাড়িকে বোঝানো হত কিন্তু মিশরীয় ইতিহাসের গতিপথের সাথে সাথে তা হারাতে বসে ছিল এমনকি রাজা, nswt এর জন্য ঐতিহ্যবাহী মিশরীয় শব্দের পরস্পরিক পরিবর্তনে মধ্যে প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও মিশরের শাসকরা সাধারণত পুরুষ ছিল, ফেরাউন শব্দটা বিরলভাবে মহিলা শাসকদের হ্মেত্রেও ব্যবহার করা হত। ফেরাউনরা বিশ্বাস করত যে দেবতা হরুসের সাথে জীবনের দেহযুক্ত সমস্ত মিশরের পৌরাণিক শাসক এবং ওসিরিসের মৃত্যুতে।

এরা নিজেদেরকে সূর্যের বংশধর মনে করত। নিজেদেরকে দেবতা বলে মনে করায় তারা বংশের বাইরে কাউকে বিবাহ করত না। ফলে ভাইবোনেদের মধ্যেই বিবাহ সম্পন্ন হত। ফেরাউনরা মৃত্যুর পরও জীবন আছে বলে বিশ্বাস করত।

সুতরাং ফেরাউনদের নাম যাই হোক, তৎকালীন শাসকদের খেতাব ছিল ফেরাউন। ইতিহাসে এ সকল শাসকরা ফিরাউন নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন হল মিশরীয় সভ্যতা। নীল নদের দেশ মিশর। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে নীলনদের তীরে গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতা এবং টিকে ছিল ৩২৩ খৃস্ট পূর্বাব্দে গ্রীক সম্রাট আলেক্সান্ডারের আক্রমনে পর্যুদস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। এর রহস্য পন্ডিতদের গবেষনার বিষয়। মিশরের উপর গড়ে উঠেছে পূরাতত্বের নতুন শাখা নাম Egyptology. প্রাচীন যুগের সপ্ত আশ্চর্্যে র মধ্যে আজও টিকে থাকা একমাত্র বিস্ময় মিশরের পিরামিড। কোথা থেকে উৎপত্তি, কিভাবে গড়ে উঠলো বিশাল পিরামিড, মন্দির,ওবেলিস্ক, বা স্ফিংসের মূর্তি সে রহস্য আজও সম্পূর্ন উদ্ঘাটিত হয় নি। নিত্য নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে গবেষনার ফলে, পালটে দিচ্ছে আগের ধারনা গুলোকে।

খৃস্ট জন্মের ৩১০০ বছর আগে রাজা মেনেস নীল নদের উভয় পাশের উত্তর এনং দক্ষিনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বসতিগুলোকে একত্রীভূত করে গোড়াপত্তন করেন মিশরীয় সাম্রাজ্যের। মেনেস হন প্রথম ফারাও।মেনেস জন্ম গ্রহণ করেন খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালে।তিনি নিম্ন (নীল নদের তীরবর্তি অঞ্চল) ও উচ্চ (নীল নদের তীর হতে দূরবর্তী অঞ্চল) মিশরকে একীভূত করে বৃহত্তর মিশর গড়ে তোলেন। এর পর বংশানুক্রমে ৩১টি রাজবংশ শাসন করেছেন নীল নদের দেশ মিশরকে। মোটামুটিভাবে এখানেই শুরু ধরা হলেও এর ও আগে এমনকি খৃস্টজন্মের ৭,০০০ বছর আগের মিশরীয় সাম্রাজ্যের শিলালিপি আবিস্কৃত হয়েছে।আমাদের যুগে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতাকে যেভাবে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎস বিবেচনা করা হয়, ঠিক একইভাবে ঐ সময়ের গ্রীক মনীষিরা মিশরীয় সভ্যতাকে জ্ঞান বিজ্ঞানের সুতিকাগার বিবেচনা করতেন। হেরোডেটাস, প্লেটো, পীথাগোরাস সবাই মিশরীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের খোজে উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন সেই সময়ের মিশরে।

নদী হল সভ্যতার প্রান কেন্দ্র। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চাষাবাস, প্রভৃতি কাজের জন্য প্রয়োজন ছিল পানি। প্রাকৃতিক জলাধার নদী ছিল পানির সহজলভ্য উৎস। তাই প্রাচীণ সভ্যতাগুলো ছিল নদীকেন্দ্রিক। উদাহরন স্বরুপ বলা যায় মেসোপটেমিয়া গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেটিস, টাইগ্রিস নদীকে ঘিরে, ভারতবর্ষে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদীর তীরে। আফ্রিকার কেন্দ্রস্থল থেকে উৎপন্ন হয়ে মিশরীয় মরুভূমির মধ্য দিয়ে নীল নদ গিয়ে মিশেছে ভূমধ্যসাগরে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নীল নদে বন্যা হত। নীলনদের এই মৌসুমী বন্যা বয়ে আনত উর্বর পলিমাটি ফলে চাষাবাস করা সম্ভব হত। পানির সহজলভ্যতা এবং খাদ্যের নিশ্চয়তার কারনেই আদিম মানুষ বসতি গড়েছিল নীল নদের তীরে। নদের দুই পাশে ২০ কিলোমিটার চওড়া এবং নদী বরাবর ৫০০ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী গড়ে উঠেছিল এই সাম্রাজ্য।

প্রাচীন মিশরে ধর্ম এবং তাদের দেব দেবতারা কেমন ছিল? আদিম প্রস্তর যুগ থেকেই মিশরের নীল নদীর তীরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল স্থায়ী বসতি। তখনকার দিনের মিশর এখনকার মত মরুভূমির দেশ ছিল না । পশু শিকার এবং চাষাবাসের জন্য আদর্শ স্থান ছিল নীল নদের দেশ মিশর। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাসের সাথে এল রীতিনীতি বিশ্বাস । কিভাবে বিশ্ব ব্রক্ষান্ডের সৃস্টি হল , সূর্য্য, বাতাস, বৃস্টি, বন্যা ইত্যাদি কেন হয়? মানূষ মারা যায় কেন? মৃত্যুর পর কি হয়? ইত্যাদি ভাবনা স্বভাবতই তাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। জন্ম নিয়েছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের। প্রথমে তা ছিল যাদুবিদ্যাকে ঘিরে। অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস থেকে জন্ম নিল দেব দেবতা এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস। সমাজ বিবর্তনে এবং সভ্যতার বিকাশের সাথে ধর্ম ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত।প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের ধর্ম বিশ্বাসকে লিখে রেখেছেন পাথরের গায়ে , সমাধি ক্ষেত্রে, গড়ছিলেন দেব দেবতাদের মূর্তি, মন্দির ইত্যাদি।
দেব দেবতারা
প্রাচীন মিশরে ২০০০ এর ও বেশী দেব দেবীর অস্তিত্বের প্রমান পাওয়া যায়। এই দেব দেবতাদের মধ্যে স্থান কাল এবং পাত্রের পার্থক্য ছিল। কোন এক স্থানে যে দেবতা শ্রেষ্ঠ হিসেবে পূজিত হতেন অন্য স্থানে ছিলেন পৃথক অন্য কোন দেবতা, আবার মিশরীয় সাম্রাজ্যের গোড়ার দিকের দেবতারা পরবর্তীকালের দেবতাদের থেকে পৃথক। এদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন মিশরীয় রাজা বা ফারাও যারা পরবর্তীতে দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। কেউ কেউ আবার ছিলেন ক্ষতিকর দেবতা । উল্লেখযোগ্য দেবতারা ছিলেনঃ- রা বা রে(Re), তাহ(Ptah) ওসিরিস(Osiris), আইসি্স‌(Isis) হোরাস(Horus), সেথ(Seth), হাথর(Hathor), আনুবিস(Anubis), থথ(Toth), আটেন(Aten), আমুন(Amun), বাস্তেত(Bastet)।

তাহ- মিশরের মেমফিসে( কায়রো’র নিকটবর্তী স্থান) উপাস্য তিন দেবতার প্রধান ছিলেন তাহ।অন্য দুই জন দেবতা ছিলেন তার পত্নী সেখমেত এবং পূত্র নেফেরতেম। শেখমেত ছিলেন সিংহের মাথাওয়ালা দেবী । তিনি সুর্যদেবতা রা’এর শত্রুদের ধ্বংশ কারী ছিলেন আর নেফেরতেম ছিলেন পদ্ম দেবতা।
তাহ’র প্রতিকৃতি হল দেবতার পীঠস্থানে হাতে লাঠিওয়ালা মমিকৃত পুরুষ হিসেবে। তিনি ছিলেন সৃস্টিকর্তা দেবতা । তিনি তার চিন্তাশক্তি এবং নির্মান ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবী সৃস্টি করেন।
মেমফিসের বিশ্বাসমতে দেবতা সোকারের সাথে তিনি ছিলেন সমাধিক্ষেত্র রক্ষাকারী মৃতদের দেবতা।গ্রীক পন্ডিতদের মতে তাহ ছিলেন ধাতুকর্মের দেবতা হেফেস্টাস।

রে (Re) রে ছিলেন সূর্য্য দেবতা। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত সূর্য্য হল জীবনের প্রতিচ্ছবি। সূর্য্যোদয়, সূর্য্যাস্ত, পূনরায় উদয় হওয়ার মতই জন্ম, মৃত্যু এবং পূনর্জন্ম। রা দেবতা কে সূর্য চাকতি বা মাথায় সূর্য্য চাকতি বয়ে নিয়ে বেড়ানো ঈগল পাখির মাথা ওয়ালা একজন পুরুষ হিসেবে। তার প্রধান উপাসনা স্থল ছিল ইউনু বা হেলিওপোলিস( সূর্য্য নগরী) রা দেবতার বিভিন্ন রুপে আবির্ভূত হতেন, সকালে খেপরী( গুবরে পোকা ),বিকালে আটুম , এবং হোরাক্তি। গিজার স্ফিংসের মুর্তি হল হোরাক্তির প্রতিফলন। রা ছিলেন ৯ জন দেবতা বা গ্রেট ইনিয়াড( Great Ennead) প্রধান। তিনি ছিলেন পরকালের সর্বোচ্চ বিচারক। মিশরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে বিবেচিত রা-পুত্র ছিলেন একজন মিশরীয় ফারাও।

ওসিরিস- যে নয়জন দেবতা গ্রেট ইনিয়াড( Great Ennead) হিসেবে বিবেচিত হতেন তাদের একজন হলেন ওসিরিস। ওসিরিস ছিলেন পরকালের বিচারক , শস্য এবং পূনর্জন্মের দেবতা। তাকে দেখানো হয়ে থাকে একজন মমিকৃত রাজা হিসাবে। সেই সময়ের জনশ্রুতি মতে প্রতিহিংসাপরায়ন ভাই সেঠ কর্তৃক খুন হলেও রাজা ওসিরিস পূনর্জন্ম লাভ করেন। ওসিরিসের উপাসনার প্রধান কেন্দ্র ছিল এবিডোস(Abydos) । তার মৃত্যু এবং পুনর্জন্ম পালিত হত বাৎসরিক উৎসবের মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন সার্ব্জনীন ভাবে পূজিত দেবতা। কারন সম্ভবত মিশরীয়রা ছিল পূনরজন্মে বিশ্বাসী এবং অনন্ত জীবন প্রত্যাশী।

আইসিস- শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় দেবী হিসেবে বিবেচিত আইসিস ছিলেন ওসিরিস পত্নী এবং হোরাসের মা। তার সম্মোহন শক্তি এবং পতিভক্তির জন্য সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। আইসিস এবং ভগ্নি নেফথিস ছিলেন মৃতদের রক্ষাকারী। নেইথ এবং সেলকেত দেবীদের সাথে মৃতদের কফিন এবং অংগ প্রত্যঙ্গের পাত্র রক্ষা করতেন আইসিস। মিশরে মৃতদেহ থেকে লিভার এবং অনান্য প্রত্যংগ বার করে রাখা হত ঢাকনা দেওয়া জার বা পাত্রে এবং মৃতদেহকে মমী করে রাখা হত। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত মৃতরা এক সময় পূনর্জন্ম লাভ করবে। সে জন্য দেহ কে মমী করে সংরক্ষন করত।

হোরাস- হোরাস হলেন আকাশের দেবতা। তিনি ছিলেন ওসিরিস এবং আইসিসের পূত্র। দেবতা সেথের হাতে ওসিরিস খুন হওয়ার পর তার জন্ম। মা আইসিস তাকে বড় করেন এবং ৮০ বছর ধরে যুদ্ধ করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেন। তিনি মিশরের শাসনকর্তা হিসেবে অভিসিক্ত হন। তিনি হলেন রাজাদের রক্ষাকারী পৃষ্ঠপোষক দেবতা। তিনি গ্রেট ইনিয়াড ৯ জন দেবতাদের একজন। ফ্যালকন বা ঈগল পাখির মাথাওয়ালা পুরুষ দেবতা হোরাস হলেন রাজাদের দেবতা। হোরাসের উপাসনাস্থল হল বেহদেত এবং হিয়েরাকোনপলিস।

সেথ- সেথ হলেন লাল দেবতা। তিনি মরুভুমি ঝড়ঝঞ্ঝা এবং ধ্বংশের দেবতা। তার প্রতিকৃতি বিভিন্ন প্রানী যেমন শুকর, গাধা, জলহস্তী বা ওকাপি ইত্যাদি বিভিন্নভাবে বিবেচিত হয়।তিনি ছিলেন দেবতা ওসিরিসের ভাই এবং দেবতা হোরাসের প্রতিদন্দ্বী। মিশরীয়রা তাকে ক্ষমতা কে ভয় এবং ভক্তি করত। গ্রীকরা তাকে দানব টাইফন এর সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

হাথর- দেবতা হাথর হলেন প্রেমের দেবী। তার প্রতিকৃতি হল গরু বা গরুর মাথা কিংবা শিং এবং কানওয়ালা মানবী। দেবী হাথর সঙ্গীত এবং মদিরার দেবী। তার উপসনাস্থল ছিল ডেনডেরা। তিনি মাতৃত্ব , সৃস্টির দেবী। অবিবাহিত মেয়েদের রক্ষাকারী এবং রাজাদের অন্নদাতা। দেবতা বেস এর সাথে তিনি মহিলাদের সন্তান জন্মের সময় রক্ষা করতেন। তিনি মিশরের সিনাই এলাকার খনি রক্ষাকারী দেবী, হোরাসের পত্নী এবং হোর-মা তাওয়ী’র মা। গ্রীক পৌরানিক ভালবাসার দেবী আফ্রোদিতি’র সমকক্ষ।

আনুবিস- আনুবিস হলেন শেয়াল দেবতা। সমাধিক্ষেত্রে শেয়ালের আনাগোনা থেকেতাকে মিশরীয়্রা মৃতদেহের দেবতা হিসেবে পূজা করতে থাকে। কাল শেয়ালের বা বন্য কুকুরের দেহ অথবা শেয়ালের মাথা ওয়ালা দেবতা আনুবিস। ওসিরিসের আগে আনুবিসকে পূজা করা হত মৃতদেহ সৎকারের দেবতা এবং সমাধিক্ষেত্রের রক্ষক হিসেবে। আনুবিসের কাছেই মিশরীয়রা মৃতদের জন্য প্রার্থনা করতেন। তিনি ওসিরিসের মৃতদেহকে সর্বপ্রথম মমীতে রুপান্তরিত করেন এবং সেই থেকে মমী প্রস্তুতের দেবতা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। মৃত্যুর পর তিনি মৃতব্যাক্তিদের পথ দেখিয়ে থাকেন।

থথ – থথ হলেন চন্দ্র দেবতা। তার প্রতিকৃতি হল সারস শ্রেনীর পাখি আইবিসের মাথাওয়ালা একজন পুরুষ। তার কাছে আইবিস পাখি এবং শুকর হল পবিত্র। লেখন পদ্ধতির আবিস্কারক থথ । মৃত্যুর পর বিচারের রায় তিনি লিখে রাখতেন মিমুসপ গাছে। থথের কাছে থাকা বইতে পৃথিবীর সমস্ত তথ্য থাকত। তার প্রধান উপাসনা স্থল হল হারমোপলিস ( এখনকার এল- আশুমুনেইন) গ্রীক পুরানের দেবতাদের দুত হারমিস এর সমকক্ষ ধরা হয় থথকে।

আমুন- আমুন শব্দের অর্থ অদৃশ্যমান। তার প্রতিকৃতি হল মাথায় লম্বা দুই পালক সমৃদ্ধ টুপি এবং হাতে দন্ড নেওয়া একজন পুরুষের। তার প্রিয় হল ভেড়া এবং রাজহাস যারা পুরুষত্বের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। মিশরের মধ্যম রাজবংশের যুগে তাকে “রা” এর সাথে একসাথে “আমুন-রা” হিসেবে পূজা করা হত। তার উপসনার স্থল ছিল থিবীস(এখনকার লুক্সর) এ । অস্টাদশ রাজবংশের যুগে আমুন সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা হিসেবে পুজিত হন। দেবতাদের রাজা হিসেবে পূজনীয় আমুনের সুবিশাল মন্দির “ কারনক” এ অবস্থিত।

আটেন- আটেন হলেন সূর্য্য চাকতি।। সুর্য্য চাকতি হিসেবে স্বর্গের দেবতারা দৃশ্যমান হতেন। ফারাও আমেনহোটেপ-৪ এর রাজত্বকালে আটেন সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ফারাও নিজের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখেন “আখেনাটেন” বা আটেনের স্বর্গীয় আত্মা। তার সময়ের আঁকা ছিবতে আটেনকে দেখান হয় হাতের উপর সুর্য্য চাকতি হিসেবে। আখেনাটেন তার স্ত্রী নেফেরতিতিকে নিয়ে নতুন এক নগর বসবাস শুরু করেন যেখানে আটেন, রা এবং আখেনাটেনের পূজা হত। আটেন ছিলেন রাজাদের দেবতা, সাধারন মিশরবাসীদের কাছে আটেনের গুরুত্ব ছিল না।
বাস্তেত- বাস্তেত ছিলেন বিড়াল দেবী। তার প্রতিকৃতি হল বিড়ালের মাথা ওয়ালা এক নারী। তিনি ছিলেন কুমারী তৎসত্বেও তার একপূত্র ছিল, নাম মিহোস। গ্রীক পোরানিক শিকারের দেবী আর্টেমিসকে বাস্তেতের সমক বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
Read More

ইতিহাসঃ অর্ধেক দুনিয়ার শাহেনশাহ আলেকজান্ডার "দ্যা গ্রেট"

February 17, 2018 0
প্রখ্যাত গ্রিক সমরনায়ক। সাধারণভাবে মহামতি আলেকজান্ডার (Alexander the great) নামে পরিচিত। গ্রিক শব্দানুসারে আলাকেজান্ডার নামের অর্থ হলো- মানুষের সাহায্যকারী {গ্রিক  αλέξω alexo (প্রতিরক্ষা করা সাহায্য করা)" + ανήρ aner (মানুষ) 
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে তিনি গ্রিসের মেসেডোনের (Macedon) রাজধানী পেল্লা (Pella) নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখ ছিল, প্রাচীন গ্রিক পঞ্জিকার হেকাটোম্বাইয়োন (Hekatombaion) মাসের ষষ্ঠ দিবস। আধুনিক গ্রেগোরিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে এই দিনটি ছিল ২০ জুলাই।
 
ইনি ছিলেন মেসেডোনের রাজা ফিলিপ (দ্বিতীয়) এবং রাজার চতুর্থ স্ত্রী ওলিম্পিয়াস (Olympias) -এর পুত্র। উল্লেখ্য রাজা ফিলিপের সাত থেকে আট জন স্ত্রী ছিলেন। এর ভিতরে ওলিম্পিয়াস ছিলেন প্রধানা রানী।

আলেক্জান্ডারের জন্মের সাথে বেশ কিছু গল্প প্রচলিত আছে। প্লুটার্চ (
Plutarch)-র মতে, ফিলিপের সাথে ওলিম্পিয়াসের বিবাহ সুসম্পন্ন হ্‌ওয়ার আগেই, অলিম্পিয়াস স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর গর্ভকে বজ্র আঘাত করেছে এবং এর ফলে একটি আগুনের শিখা চারিদিক ছড়িয়ে পড়ছে। এর কিছুদিন পর ফিলিপের সাথে বিবাহ হয়। ফিলিপ স্বপ্নে দেখেন যে, অলিম্পাসের গর্ভকে সিংহ-চিহ্নিত সিল দ্বারা রক্ষিত হচ্ছে। প্লুটার্চ এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলেন যে, অলিম্পিয়াসের বিবাহের আগেই দেবরাজ 
জিউস -এর দ্বারা গর্ভবতী হয়েছিলেন। আলেক্জান্ডারের জন্মের সময় তুরস্কের বন্দর নগরী ইজমির ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই এ্যাফেসাস নগরীতে অবস্থিত আর্তেমিসের মন্দির আগুনে পুড়ে যায়। সে সময়ের পুরোহিতরা এর ব্যাখ্যায় বলেন যে,  আলেকজান্ডারের জন্মের সময়, আর্তেমিস তাঁর মন্দির রক্ষা করার বদলে অলিম্পিয়াসের কাছে ছিলেন।
 
শৈশবে লানিকে (Lanike) নামক একজন সেবিকার কাছে তিনি প্রতিপালিত হন। এরপর তিনি লেওনিডাস নামক একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই সময় লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি বীণা বাজানো, ঘোড়ায় চড়া, যুদ্ধ, শিকার ইত্যাদির চর্চা করেন। আলেকজান্ডারের দশ বৎসর বয়সে একজন ব্যবসায়ী রাজা ফিলিপের কাছে একটি ঘোড়া বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসে। এই ঘোড়াটি এতটা অস্থির ছিল যে, এর ধারে কাছে কেউ যেতে পারছিল না। আলেকজান্ডার এই ঘোড়াটি কেনার জন্য তাঁর পিতার কাছে আবদার করেন। ফিলিপ এই ঘোড়া কেনার বিষয়ে শর্ত দিয়ে বলেন যে, যদি আলেকজান্ডার এই ঘোড়াটাকে বশে আনতে পারে, তবেই তাকে ঘোড়াটাকে কিনে দেবেন। আলেকজান্ডার তাতেই রাজি হন। ইনি লক্ষ্য করে দেখলেন, ঘোড়াটা তার নিজের ছায়া দেখে  ভীত হয়ে লাফাচ্ছে। তাই তিনি ঘোড়াটার সূর্যের দিকে মুখ করালেন, যেন সে তার নিজের ছায়ার দিকে লক্ষ্য করতে না পারে। এইভাবে তিনি সহজে ঘোড়াটাকে বশে আনলেন। এরপর ফিলিপ আলেকজান্ডারকে ঘোড়াটি কিনে দিলেন। আলেকজান্ডার পরে ঘোড়াটার নামকরণ করলেন, বুসেফেলাস (যার অর্থ ষাড়ের মাথা)। উল্লেখ্য বুসেফেলাস আলেকজান্ডারের শেষ যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত সকল যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সাথে ছিল। উল্লেখ্য ভারতের ঝিলম নদীর তীরে আলেকজান্ডার এই ঘোড়াটির নামে বুসেফেলাসের নামক একটি নগর তৈরি করেছিলেন।

আলেকজান্ডারের বয়স যখন ১৩ বৎসর বয়স, তখন তাঁর পিতা তাঁর জন্য একজন ভালো শিক্ষক খুঁজছিলেন। রাজা ফিলিপ আলেকজান্ডারকে এ্যারিস্টোটল-এর মিয়েজা (Mieza) নামক একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানে তিন টলেমি, হেফাইস্টাশান, ক্যাসান্ডার-এর মতো বেশ কিছু বন্ধু লাভ করেন। এঁরা সবাই এ্যারিস্টোটল-এর কাছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, নীতিশাস্ত্র, ধর্ম, যুক্তিবিদ্যা এবং শিল্পকলা সম্পর্কে বিশেষ শিক্ষা লাভ করেন।
 
১৬ বৎসর বয়সে আলেকজান্ডার এ্যারিস্টোটল-এর কাছে তাঁর লেখাপড়া শেষ করেন। এই সময় বাইজান্টাইনদের সাথে যুদ্ধের কারণে ফিলিপ মেসেডোন ত্যাগ করেন। ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে মেসেডোনের শাসনভার অর্পিত হয় আলেকজান্ডারের উপর। একই সময় থ্রেসিয়ান মিডি উপজাতির লোকেরা মেসেডোনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘো্ষণা করে। আলেকজান্ডার দ্রুত এই বিদ্রোহ দমন করেন। এরপর ইনি মিডিদের এলাকাকে গ্রিকের উপনিবেশে পরিণত করেন। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪০ অব্দে থ্রেসিয়ানে একটি নগর স্থাপন করেন। এই নগরীর নাম করেন আলেকজান্ড্রোপোলিস (Alexandropolis)।
 
এরাজা ফিলিপ ফিরে আসার পর, তিনি দক্ষিণ থ্রেসের বিদ্রোহ দমনের জন্য ছোট একটি সেনাদলসহ আলেকজান্ডারকে পাঠান। আলেকজান্ডার থ্রেস দখল করার পর, ইল্লিয়ার দখল করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৮ অব্দে ফিলিপ এবং আলেকজান্ডার সম্মিলিতভাবে থের্মোপাইলি দখল করে। এরপর এঁরা এলাটেয়া (Elatea) দখল করার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এই সময় এথেন্স এবং থিবিস মেসেডোনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।  গ্রিসের বোয়েসিয়া (Boeotia) অঞ্চলের ক্যারোনিয়া (Chaeronea) শহরের নিকটে এথেন্স এবং থিবিস-এর যৌথবাহিনী অবরোধ করে। ফিলিপ ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ করেন, পক্ষান্তরে আলেকজান্ডার বাম প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ করেন। আলেকজান্ডার থিবিয়ানদের পরাজিত করেন। এরপর ফিলিপও এথেন্স-বাহিনীকে পরাজিত করেন। এই জয়ের পর এঁরা বিনা বাধায় পেলোপোনিজ-এ প্রবেশ করেন। এরপর এদের যৌথ বাহিনী স্পার্টা (Sparta) নগরীতে প্রবেশ করে। এই নগরীর লোকেরা এঁদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করে নি, কিন্তু এঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করে নি। কোরিন্থ নগরে রাজা ফিলিপ একটি সমন্বিত গ্রিক বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাহিনী Hellenic Alliance নামে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই বাহিনীতে স্পার্টা ছাড়া সকল নগর-রাষ্ট্র যোগদান করেছিল। এই সময় ফিলিপ Hegemon (সর্বাধিনায়ক) হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি পারশ্য আক্রমণের ঘোষণা দেন।
 
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৭ বা ৩৩৮ অব্দে ফিলিপ মেসিডোনিয়ান ক্লিওপেট্রা ইউরিদাইস (Cleopatra Eurydice)-কে তার পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। আলেকজান্ডারের মা অলিম্পাস ছিলেন পশ্চিম গ্রিক উপত্যকার ইপিরাস-এর অধিবাসী। এই অর্থে ইপিরাস মেসিডোনিয়ার অংশ ছিল না, অপরদিকে ক্লিওপেট্রা ছিলেন পুরোপুরি মেসিডোনের অধিবাসী। এই বিচারে ক্লিওপেট্রার সন্তানদের রাজ্যে পূর্ণ অধিকার থাকবে এবং আলেকজান্ডারের অধিকার থাকবে তার অর্ধেক। প্লুটার্কের মতেক্লিওপেট্রার চাচা এ্যাট্টালাস (Attalus) ফিলিপ-ক্লিওপেট্রার বিয়ের ভোজ-সভায় ঘোষণা দেন, এই ভোজ-অনুষ্ঠানই নির্দেশ করবে ভবিষ্যত মেসিডোনিয়ার শাসক কে হবে। আলেকজান্ডার ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর পানপাত্র এ্যাট্টালাসের মাথায় নিক্ষেপ দিকে ধরে চিৎকার করে বলেন, "তুমি খলনায়ক, তবে আমি কি, জারজ সন্তান?" এই সময় ফিলিপ এ্যাট্টালাসের পক্ষ নিয়ে আলেকজান্ডারের দিকে ধেয়ে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু নেশার ঘোরে পা পিছলে মেঝেতে পরে যান। এরপর অপমানিতচিত্তে আলেকজান্ডার চিৎকার করে বলেন, "এখানে একব্যক্তি (আলেকজান্ডার স্বয়ং) গ্রিস থেকে এশিয়া জয় করার পরিকল্পনা করছে, তার এই ইচ্ছার আসন থেকে সরানো যাবে না "। 

এরপর আলেকজান্ডার, তাঁর মা অলিম্পাসকে সাথে নিয়ে ইপিরাসে চলে যান। উল্লেখ্য ইপিরাসের রাজা আলেকজান্ডার প্রথম (
Alexander I) ছিলেন তাঁর মামা। এই সময় আলেকজান্ডারের বোন ক্লিওপেট্রা পেল্লাতেই থেকে যান। এই অবস্থায় ফিলিপ 'আলেকজান্ডার প্রথম'-এর সাথে জোট বাধার জন্য, তাঁর কন্যা ক্লিওপেট্রাকে 'আলেকজান্ডার প্রথম-এর (ক্লিওপেট্রার মামা) সাথে বিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। ফলে আলেকজাণ্ডারের মা অলিম্পাস যখন 'আলেকজান্ডার প্রথম'কে ফিলিপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার কথা বলেন। তখন 'আলেকজান্ডার প্রথম' এই যুদ্ধে রাজি হলেন না। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৬ অব্দে 'আলেকজান্ডার প্রথম'-এর সাথে ফিলিপের মেয়ে ক্লিওপেট্রার বিবাহের সময়, ফিলিপের দেহরক্ষী পাউসানিয়াস(Pausanias) তাঁকে হত্যা করে। ধারণা করা হয়, ফিলিপের খুনের পরিকল্পনাকারী ছিলে আলেকজান্ডার অথবা অলিম্পাস অথবা উভয়ই। কিন্তু ফিলিপের মৃত্যুর পরপরই আলেকজান্ডারে বন্ধুরা পাউসানিয়াস-কে হত্যা করেন। ফলে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কারা জড়িত ছিল, তা জানা যায় নি।
 
ফিলিপের মৃত্যুর পর মেসেডোনিয়ার অভিজাত সমাজ এবং সেনাবাহিনী আলেকজান্ডারকে মেসিডোনিয়ার রাজা হিসেবে ঘোষণা দেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৬ অব্দের অক্টোবর মাসে আলেকজান্ডার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমে তিনি তাঁর নিকট আত্মীয় লাইনেস্টিস (Lyncestis)-এর দুই রাজপুত্র Heromenes এবং Arrhabaeus-কে রাজা ফিলিপের হত্যাকারী সন্দেহে মৃত্যদণ্ড দেন। এঁদের অপর ভাই Alexander Lyncestes আলেকজান্ডরকে রাজা হিসাবে মেনে নেওয়ার কারণে, তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ক্লিওপেট্রা ইউরিডাইস, তাঁর কন্যা ইউরোপা এবং  এ্যাট্টালাসকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কথিত আছে, আলেকজান্ডারের রাজত্বকে নিষ্কণ্টক করার জন্য রানী অলিম্পাসের আদেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।
 
ফিলিপের মৃত্যু এবং তরুণ আলেকজান্ডার ক্ষমতা গ্রহণের সংবাদ প্রচার হওয়ার পরপরই অনেক রাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রগুলো ছিল থিবিস, এথেন্স, থেস্যালি উত্তর মেসিডোনের থ্রসিয়ান গোত্রসমূহ।
 
বিদ্রোহী থেস্যালিয়ান (Thessalian) বাহিনী অলিম্পাস এবং ওস্সা পর্বতের মধ্যবর্তী গিরিপথ দখল করে নেয়। আলেকজান্ডরের সৈন্যরা ওস্স্যা রাতের অন্ধকারে পর্বতের উপরে উঠে থেস্যালিয়ান সৈন্যদের ঘিরে ফেলে। সকালে থেস্যালিয়ান সেনাপতি আলেকজান্ডারের সৈন্যদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। এরপর আলেকজান্ডার দ্রুত অধিকৃত সেনা-সরঞ্জাম তাঁর বাহিনীর সাথে যুক্ত করে পেলোপোন্নেসে-এর (Peloponnese)-পথে রওনা দেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৫ অব্দের ভিতরেই আলেকজান্ডার মেসিডোনিয়ার উত্তর সিমান্তের ডানবির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। থিবস্‌ সর্বশক্তি দিয়ে আলেকজান্ডারের প্রতিরোধ করেও জয়ী হতে পারে নি। থিবস জয়ের পর আলেকজান্ডার থিবস্‌ নগরীকে ধ্বংস করে দেন এবং এর অঞ্চলসমূহ বিওশিয়ান নগরগুলির ভিতর ভাগ করে দেন। নগরীর সকল নাগরিককে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র পুরোহিত, মেসিডোনিয়ার আগের নেতারা ও পিন্দারের বংশধরদের মুক্তি দেওয়া হয়। শুধুমাত্র পিন্দারের বাড়িটিই অভিযানের পর দণ্ডায়মান ছিল। থিবসের পরিণতি দেখে এথেন্স আত্মসমর্পণ করে। 

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪ অব্দে প্রায় ৪৮,০০০ পদাতিক, ৬০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্যের নিয়ে হেলিস্পন্ট (
Hellespont) অতিক্রম করেন। এছাড়া তাঁর সাথে ১২০টি যুদ্ধজাহাজের একটি বহর। এই বহরে নৌসৈন্য ছিল প্রায় ৩৮,০০০। এই বাহিনীর বেশির ভাগ সৈন্য ছিল মেসিডোন এবং গ্রিসের। তাছাড়াও কিছু থ্রাসিয়ান, পাইওনিয়ান এবং ইলিরিয়ান সৈন্য এই বাহিনীতে ছিল।
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৪ অব্দে গ্রানিকাসে (Granicus)-এ পারস্যবাহিনীর সাথে আলেকজান্ডারের মোট তিনবার যুদ্ধ হয়। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি জয়লাভ করেন। এরপর আলেকজান্ডার পারস্যের প্রাদেশিক রাজধানী সার্দিস (Sardis) দখল করেন। এই নগরী অধিকারের ফলে সার্দিসের‌ অর্থভাণ্ডার তাঁর দখলে আসে। এরপর তিনি আইওনিয়া (Ionian) উপকুল ধরে এগিয়ে যান। হেলিকারনাস-এ আলেকজান্ডার সফলভাবে যুদ্ধের দ্বারা বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করেন। তার বিপক্ষের রোডস্‌-এর মেমন (Memnon) এবং কারিয়ার পারস্যিয়ান সাত্রাপ (Persian satrap of Caria) সমুদ্র পথে পালিয়ে যায়। আলেকজান্ডার কারিয়ার (Caria) শাসন ভার এডার (Ada) কাছে ছেড়ে দেন। পরে অবশ্য এডাকে তার ভাই পিক্সোদারাস ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।
 
হেলিকারনাসাস্‌ থেকে আলেকজান্ডার পাহাড়ি লিসিয়া (Lycia) এবং প্যামফিলিয়ান (Pamphylian) সমতল ভূমি বরাবর অভিযান পরিচালনা করেন। এই সময় তিনি পথে সকল উপকূলীয় শহর দখল করেন। প্যামফিলিয়া থেকে সামনে আর কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান না থাকায় আলেকজান্ডার উপকূল ছেড়ে মূল ভূখণ্ডের দিকে অভিযান শুরু করেন। এই পথে  টারমেসাসে (Termessos) আলেকজান্ডার পিসিডিয়ান (Pisidian) নগরী দখল করেন।
 
এরপর প্রাচীন ফ্রিজিয়ান (Phrygian) রাজ্যের রাজধানী গোড়ডিয়ামে পৌঁছলে সেখানে তাকে জানানো হয় যে, সেখানে অ্যাপোলোর মন্দিরে একটি দড়ির জট (Gordian Knot) রাখা আছে। কথিত আছে এই জট খুলতে পারবে 'এশিয়ার রাজা' সে হবে। মন্দিরের পুরোহিতদের এই কথা শোনার পর, আলেকজান্ডার তলোয়ার দিয়ে জটটি কেটে ফেলেন। অন্য মতে তিনি কৌশলে জটটি খুলতে পেরেছিলেন।
 
শীতকাল শেষ হলে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩ অব্দে আলেকজান্ডার তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে সিসিলিয়ান দরজা পার হন। এরপর তিনি পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের মূল সেনাবাহিনীর মুখোমুখী হন। এই যুদ্ধটি ইসাস-এর যুদ্ধ (Battle of Issus) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ স্বয়ং দারিয়ুসের তাঁর সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করেছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩ অব্দের নভেম্বর মাসে এই যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুস পরাজিত হন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। এই সময় দারিয়ুস তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা, তাঁর মা সিসিগাম্বিস্‌ এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদের বেশির ভাগ ফেলে যান। দারিয়ুস ভূ-মধ্যসাগরের উপকুল ধরে টায়ার এবং গাজা অঞ্চলে চলে যান। এদিকে আলেকজান্ডার জেরুজালেমের নিকটবর্তী জুডিয়া দিয়ে এগিয়ে যান। তবে আলেকজান্ডার জেরুজালেমে প্রবেশ করেন নাই। পরে দারিয়ুস আলেকজান্ডারের কাছে, তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য ১০,০০০ ট্যালেন্ট (স্বর্ণমুদ্রা) মুক্তিপণ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। একই সাথে তিনি তাঁর হারানো রাজ্যের জন্য একটি চুক্তি করার প্রস্তাব পাঠান। আলেকজান্ডার সংক্ষিপ্ত দারিয়ুসকে উত্তরে জানান যে, 'তিনি বর্তমানে এশিয়ার একক রাজা, তাই রাজ্য ভাগাভাগির বিষয়টি কে সিদ্ধান্ত দেবে?'।
 
এরপর আলেকজান্ডার সিরিয়া দখল করেন এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৩ অব্দে আলেকজান্ডার টায়ার (Tyre) আক্রমণ করেন। একটি দীর্ঘকালীন যুদ্ধের শেষ তিনি টায়ার অধিকার করেন। তিনি যুদ্ধ করার উপযুক্ত সকল পুরুষদের হত্যা করেন এবং নারী ও শিশুদের দাস হিসাবে বিক্রয় করে দেন। এরপর আলেকজান্ডার দ্রুত মিশরের অন্যান্য নগরগুলো দখল করে নেন। তবে গাজা অঞ্চলে প্রচুর দুর্গ থাকায়, তিনি প্রথমে এই এলাকা দখলের চেষ্টা করেন নি।  ছোটো ছোটো শহরগুলো দখল করার পর, তিনি গাজা দখলের জন্য আক্রমণ চালান। তিনি পর পর তিনবার গাজা দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এই সময় তিনি কাঁধে মারত্মক আঘাত পান। চতুর্থবারে তিনি গাজা দখল করতে সমর্থ হন। এখানেও তিনি টায়ারের মতো যুদ্ধ করার উপযুক্ত সকল পুরুষদের হত্যা করেন এবং নারী ও শিশুদের দাস হিসাবে বিক্রয় করে দেন।
 
এরপর তিনি জেরুজালেমে অভিযান পরিচালনা করেন। মূলত জেরুজালেমে আলেকজান্ডারকে কোনো যুদ্ধ করতে হয় নি। টায়ার এবং গাজার পরিণতি দেখে জেরুজালেমের অধিপতি আত্মসমর্পণ করেন। এখানে তিনি একটি ভবিষ্যৎবাণীর বইতে দেখেন যে, কোনো এক গ্রিক বীর পারশ্যের রাজাকে পরাজিত করে জেরুজালেম দখল করবেন এবং মিশরের দিকে যাত্রা করবেন।
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে আলেকজান্ডার মিশরের দিকে অগ্রসর হন। যুদ্ধের পরিবর্তে মিশরবাসীরা আলেকজান্ডারকে মিশরে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগতম জানায়। সে সময় লিবিয়ান মরুভূমির সিউয়া (Siwa) উপত্যাকার অধিবাসীরা মিশরে প্রধান দেবতা আমুনের পুজারী ছিলেন। আমুনের পুরোহিতরা আলেকজান্ডারকে আমুনের পুত্র হিসাবে স্বীকৃতি দেন এবং নব্য পৃথিবীর প্রভু হিসাবে ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য গ্রিসে আলেকজান্ডারকে জিউস-এর পুত্র হিসাবে মান্য করা হতো। কথিত আছে, আলেকজান্ডার নিজেই জিউসকে তাঁর পিতা বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়ের মুদ্রায় আলেকজান্ডারের প্রতিচ্ছবিতে তাঁর মাথায় ভেড়ার শিং থাকত।
 
আলেকজান্ডার মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর এই আলেকজান্দ্রিয়া মিশরে টলেমী শাসকদের রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। মিশর জয়ের পর আলেকজান্ডার আরো পূর্বে আসরিয়ার (বর্তমানে উত্তর ইরাক) দিকে অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে দারিয়ুস এর নেতৃত্বে গৌগামেলার (Battle of Gaugamela) যুদ্ধে আলেকজান্ডার পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে দারিয়ুসের রথের সারথীর মৃত্যুবরণ করলে দারিয়ুস আবার পালাতে থাকেন এবং আলেকজান্ডার তাকে আরবেলা পর্যন্ত ধাওয়া করেন। দারিয়ুস ইকবাটানা পাহাড়ে আশ্রয় নিলে আলেকজান্ডার ব্যাবিলনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে গ্রিক আলেকজান্ডার মিশরের প্রাচীন রাকোটিশ (Rhacotis) নগরীকে ঢেলে সাজান। আলেকজান্ডারের নামানুসারে এই নাগরীর নামকরণ করা হয় আলেকজান্দ্রিয়া  আলেকজান্ডার-এর প্রধান স্থপতি ডাইনোক্র্যাটেস (Dinocrates)-এর উপর এই নগর নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মূলত আলেকজান্ডার মিশরের নাউক্রেটিস (Naucratis) নগরীরর উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য এবং গ্রিস নীল-উপত্যাকার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এই নগরী স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই ভিত্তি স্থাপন করে আলেকজান্ডার মিশর ত্যাগ করেন। এরপরে তিনি আর মিশরে ফিরে আসেন নি।
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে মিশর ত্যাগ করে তিনি ম্যাসেপটেমিয়ার দিকে অগ্রসর হন। পথে গুয়াগামেলা নামক স্থানে দারিয়ুসের সাথে আলেকজান্ডারের বাহিনীর দেখা হয়। গুয়াগামেলার যুদ্ধে  ( Battle of Gaugamela)দারিয়ুস পরাজিত হয়ে একবাটানা (Ecbatana, বর্তমানে এর নাম হামেডান (Hamedan)) পার্বত্য এলাকায় পালিয়ে যান। এরপর আলেকজান্ডার ব্যবিলন দখল করেন।
 
ব্যববিলন থেকে আলেকজান্ডার অ্যাকামেনিড-এর একটি প্রাদেশিক রাজধানী সুসা (Susa) দখল করেন এবং এই নগরীর কিম্বদন্তীতুল্য রাজকীয় কোষাগার দখল করেন। এরপর তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ রয়েল রোড হয়ে পারস্যের রাজধানী পার্সেপলিস্-এর দিকে পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে, নিজে সরাসরি পারস্যের দিকে অগ্রসর হন। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তিনি পারশ্যের দরজা নামে খ্যাত  জাগরস্‌ পর্বত (Zagros Mountains) দখল করেন। এখানে আরিওবার্জানেস (Ariobarzanes) -এর পরিচালিত পারস্যের সেনাবাহিনী'র বাধার সম্মুখীন হন। এই যুদ্ধে পারশ্য সৈন্যকে পরাজিত করে পার্সেপলিস্‌ (Persepolis) দখল করেন। এখানকারএর রাজকোষ লুট হবার আগেই সেখান থেকে চলে যান। পরে অবশ্য আলেকজান্ডার সেনাবাহিনী মনের সুখে পার্সেপলিস্‌ লুট করে। এই সময় পার্সেপলিসের পূর্ব দিকের প্রাসাদ জেরেসেক্স (Xerxex) আগুনে লাগে এবং একসময় তা পুরো শহরকে ভষ্মীভূত করেছিল।
 
এই সময় দারিয়ুস পারশ্যের সিংহাসনে বসার উপযুক্ত দারিয়ুস বিকল্প ব্যক্তির সন্ধান করতে থাকেন। এদিকে, দারিয়ুস অপহৃত হন। তাঁর ব্যাক্ট্রিয়ার গভর্নর, বেসাস্‌ ও এক পুরুষ আত্মীয়ের সহকারীরা তাঁকে হত্যা করে। বেসাস্‌ নিজেকে দারিয়ুসের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে এবং আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা করে মধ্য এশিয়ার দিকে হটতে থাকেন। দারিয়ুসের মৃত্যুর পর আলেকজান্ডার প্রতিশোধের এই যুদ্ধের ইতি ঘোষণা করেন এবং গ্রিক ও অন্যান্য মিত্রদেরকে লীগ অফ করিন্থ হতে মুক্ত করে দেন। তবে, যারা স্বেচ্ছায় তার সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণে উৎসাহী ছিল তিনি তাদের সেনাবাহিনীতে গ্রহণ করেন।

আলেকজান্ডার প্রায় তিন বছর প্রথমে বাসাস্‌ এবং পরে সোগডিয়ানা, স্পিটামেনস্‌-এর গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযান চালাতে গিয়ে আলেকজান্ডার মিডিয়া, পার্থিয়া, আরিয়া, ড্রাজিয়ানা, আর্কোশিয়া, ব্যাক্ট্রিয়া এবং সিথিয়া জয় করেন। তিনি আফগানিস্থানের হেরাত এবং সমরখন্দ দখল করেন। আলেকজান্ডার অনেকগুলো নতুন আলেকজান্ড্রিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলোর মধ্যে আছে আধুনিক কালের আফগানিস্তানের কান্দাহার এবং আলেকজান্ড্রিয়া ইসচেট (বর্তমানে তাজাকিস্তানে)।
 
বেসাস (Bessus) খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৯ অব্দে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে আলেকজান্ডারের একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি টলেমি এই বিদ্রোহ দমন করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৮ অব্দে স্পিটামেনস্‌ (Spitamenes) বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আলেকজান্ডার স্বয়ং এর বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেন এবং  গাবাই যুদ্ধে (Battle of Gabai) স্পিটামেনস্‌ পরাজিত হন। পরে অবশ্য স্পিটামেনস্‌ তাঁর নিজের লোকের হাতেই নিহত হন।
 
পারশ্য দখল করার পর আলেকজান্ডার পারশ্য সংস্কৃতি দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। প্রথম তিনি পারশ্য রাজ উপাধি শাহানশাহ ব্যবহার করা শুরু করেন। এছাড়া পোশাক-পরিচ্ছদে পারশ্য ধারার উপকরণ যুক্ত করেন। অধ্বস্তনরা হাঁটু মুড়ে তাঁর সামনে বসে হাতে চুম্বন করে আনুগত্য প্রকাশ করতো।
 
স্পিটামেনস্‌-এর মৃত্যুর পর, আলেকজান্ডার ভারত অভিযানে মনস্থির করেন। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতের দিকে যাত্রা করেন। কাবুলের নিকবর্তী কয়েকটি স্থানে তিনি সৈন্যশিবির স্থাপন করে স্থানীয় রাজন্যবর্গের প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। তক্ষশীলার রাজা অম্ভি আলাকজান্ডারকে জানান যে, যদি আলেকজান্ডার তাঁর রাজ্য আক্রমণ না করেন, তবে তিনি আলাকজান্ডারকে ভারত প্রবেশে সাহায্য করবেন। এই সময় আলেকজান্ডার কোফিউস, শশীগুপ্ত সঞ্জয় প্রমুখ স্থানীয় রাজাদের কাছ থেকেও সাহায্য পেয়েছিলেন।
 
এরপর কাবুল উপত্যাকা দিয়ে আলেকজান্ডার অগ্রসর হলে পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টক বাধা দেন। যুদ্ধে অষ্টক পরাজিত ও নিহত হলে, আলকজান্ডার পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এই সময় অষ্টক জাতির লোকেরা আলাকজান্ডারের বাহিনীকে প্রাণপণে বাধা দেন। যুদ্ধে আলেকজান্ডারের বাহিনী ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায় এবং প্রায় ৪০,০০০ সাধারণ মানুষকে বন্দী করে। পুষ্কলাবতী জয় করার পর, বিনা যুদ্ধে আলেকজান্ডার তক্ষশিলায় প্রবেশ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশিলায় প্রবেশ করেন।
 
তক্ষশিলার রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে তক্ষশিলায় অভ্যর্থনা করেন। এরপর অভিসার জাতির নেতাও বশ্যতা স্বীকার করে। এই সময় চন্দ্রগুপ্ত নন্দরাজকে উৎখাত করার লক্ষ্যে গ্রিকদের সাহায্য পাওয়ার জন্য আলেকজান্ডারের শিবিরে যান। আলেকজান্ডার প্রথমে তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। কিন্তু চন্দ্রগুপ্ত উদ্ধত ব্যবহারের জন্য, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যু দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। কিন্তু কৌশলে তিনি গ্রিক সৈন্যদের হাত থেকে পালিয়ে বিন্ধ্যাপর্বতের গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেন।
 
এরপর আলেকজান্ডার তক্ষশিলা থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ঝিলম নদীর তীরে পৌঁছায়। প্রথমে আলেকজান্ডার পুরুকে বশ্যতা স্বীকারের জন্য অনুরোধ করলে, পুরু যুদ্ধ করার সংকল্প নেন। ঝিলম নদীর তীরে উভয় সেনাবহিনী মুখোমুখী হয়। এই সময় পুরুর সেনাবাইনীতে ছিল ৩০ হাজার পদাতিক, ৪ হাজার অশ্বারোহী. ৩ শত যুদ্ধরথ এবং ২ শত হাতি। যুদ্ধে পুরু পরাজিত হন। তবে যুদ্ধে পুরুর অসীম সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে, আলেকজান্ডার পুরুকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন। এই সময় ঝিলম নদীর তীরে তিনি দুটি নগর পত্তন করেন। এই নগর দুটি হলো বুসেফেলা ( Bucephala) ও  নিকয়া (Nicaea)।
 
এরপর আলেকজান্ডার পুরুর রাজ্যের পূর্ব দিকের আরও কয়েকটি রাজ্য জয় করেন এবং বিপাশা নদীরে তীরে এসে আস্তান গাড়েন। এরপর আলেকজান্ডারের সৈন্যরা আর পূর্বদিকে অগ্রসর হতে রাজি হন নি। এর পিছনে ঐতিহাসিকরা যে কারণগুলো উল্লেখ করেন তা হলো
  • দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধের কারণে সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে সৈন্যরা গৃহকাতরতায় ভুগছিল।
  • পুরুর এবং অন্যান্য ছোটো ছোটো রাজন্যবর্গের সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে আলাকজান্ডারের বিপুল সৈন্য হতাহত হয়েছিল। সৈন্যরা মনে করেছিল, পূব-দিকের বড় রাজ্যগুলোর সাথে যুদ্ধে তাদের পরাজয় হবে। বিশেষ করে বঙ্গদেশের গঙ্গারিডাই রাজ্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আলেকজান্ডারের সৈন্যরা অগ্রসর হতে রাজি হয় নি। গঙ্গারিডাই রাজ্য সম্পর্কে ভীত হওয়ার পিছনে যে ঐতিহাসিক তথ্য কাজ করেছিল, তা হলো মেগাস্থিনিস (৩৫০-২৯০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ ) আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও বন্ধু সেলুকাসের রাজত্বকালে গ্রিক দূত হিসাবে ভারতে এসেছিলেন। তাঁর মতে 'গঙ্গারিডাই রাজ্যের বিশাল হস্তী-বাহিনী ছিল। এই বাহিনীর জন্যই এ রাজ্য কখনই বিদেশী রাজ্যের কাছে পরাজিত হয় নাই। অন্য রাজ্যগুলি হস্তী-বাহিনীর সংখ্যা এবং শক্তি নিয়ে আতংকগ্রস্ত থাকিত'
    'ভারতের সমূদয় জাতির মধ্যে গঙ্গারিডাই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গঙ্গারিডাই রাজার সুসজ্জিত ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত চার হাজার হস্তী-বাহিনীর কথা জানিতে পারিয়া আলেকজান্ডার তাহার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন না' - ডিওডোরাস (৯০-৩০খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ)

    ডিওডোরাস ও ক্যুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস উভয়েই উল্লেখ করেছেন নন্দরাজের সেনাবাহিনীতে পদাতিক সৈন্য ২ লক্ষ, অশ্বারোহী সৈন্য ২০ হাজার, রথ ২ হাজার, এবং তিন থেকে চার হাজার হাতি ছিল।

    ধ্রুপদী গ্রিক ও ল্যাটিন বর্ণনায় রাজার নাম আগ্রাম্মেস। তিনি ছিলেন নীচকূলোদ্ভব নাপিতের পূত্র। হিন্দু পুরাণে তিনি মহাপদ্মনন্দন এবং বৌদ্ধ শাস্ত্র মাহাবোধিবংশে উগ্রসেন, অর্থ এমন এক ব্যক্তি যাঁর 'প্রকাণ্ড ও পরাক্রান্ত সেনাবাহিনী' আছে। হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব নামক জৈন গ্রন্থেও মহাপদ্মনন্দকে বলা হয়েছে নাপিত কুমার। পুরাণে বলা হয়েছে শূদ্রোগর্ভোদ্ভব। আরও বলা হয়েছে, 'সর্বক্ষত্রান্তক নৃপঃ' অর্থাৎ সকল ক্ষত্রিয়কে নিধন করে সিংহাসনে বসেছিল।
আলেকজান্ডার ভারতের পূর্ব-দিকের অভিযান ত্যাগ করেন। তিনি ঝিলম ও বিপাশা নদীর মধ্যাভাগের অঞ্চল পুরুকে এবং সিন্ধু ঝিলম নদীর মধ্যভাগের অঞ্চল অম্ভির কাছে ছেড়ে দেন এবং আলেকজান্ডার পারশ্যে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। তিনি সেনাবাহিনীর একটি অংশকে সাগর পথে পারশ্যে প্রেরণ করেন। সেনাবাহিনীর অপরাংশ নিয়ে তিনি পাঞ্জাব ও বেলুস্তিতানের মধ্য দিয়ে পারস্যের দিকে রওনা হন। পথে তিনি কিছু কিছু ক্ষুদ্র জাতির দ্বারা আক্রান্ত হলে, সবাইকে পরাজিত করে পারশ্যের পথে অগ্রসর হন। 
 
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ অব্দে তিনি পারস্যের সুসা নগরে পৌঁছান। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের জুন মাসের ১১ বা ১২ তারিখে ব্যাবিলনে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের প্রাসাদে মৃত্যুবরণ করেন।

আলেকজান্ডারের স্ত্রী এবং সন্তান
স্ত্রী : রোক্সানা (
Roxana)
         পুত্র : 
 Alexander IV Aegus.
স্ত্রী : স্টাটেরিয়া দ্বিতীয় (Stateira II)
        পুত্র : 
Philip III of Macedon
 
স্ত্র : (পারসিয়ার পারিসাটিস দ্বিতীয়) : Parysatis II of Persia
Read More

Post Top Ad